গাজী হাবিব : সাতক্ষীরা জেলায় জ্বালানি তেলের চলমান সংকট এখন আর শুধু মোটরবাইকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে জনজীবন, অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আগের দিন রাত থেকেই ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, পরিবহন সংকট, কৃষিকাজে বিঘ্ন- এসব এখন নিত্যদিনের চিত্র। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, এই সংকটের মূল কারণ শুধু জ্বালানির ঘাটতি নয়; বরং সুষ্ঠু বণ্টন পরিকল্পনার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।

জ্বালানি সংকটকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গভীর রাতে মোটরসাইকেল রেখে ‘সিরিয়াল’ দখল করা হচ্ছে। পরে সকালে সেই সিরিয়াল টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে- ভোরের আলো ফোটার আগেই পাম্পের সামনে শত শত মোটরসাইকেলের সারি। কিন্তু এসব বাইকের বেশিরভাগের কাছেই কোনো চালক নেই। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু যুবক আগেই ৩০-৪০টি বাইক এনে সারিতে রেখে দেয়। ফলে সকালে আসা সাধারণ মানুষ দেখতে পান তাদের সামনে বিশাল এক ‘ভুতুড়ে’ লাইন। প্রতিবাদ করলে হামলা কিংবা ‘মব’ তৈরির হুমকিও দেওয়া হচ্ছে- যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে জরুরি সেবায়। অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক, সাংবাদিক, জরুরি পণ্যবাহী যানবাহন- এসবের জন্য কোনো আলাদা লেন বা অগ্রাধিকার নেই। যদিও জেলার দুটি উপজেলায় অগ্রাধিকার রাখা হয়েছে- সেখানেও মব সৃষ্টি করে সাংবাদিককে চরম হেনস্থা করা হয়েছে।

আমরা দেখেছি- পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে ড্রাম বা বোতলে ভরে গোপনে বিক্রির ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটছে। এই তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ৮০- ১০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং সাধারণ ভোক্তারা আরও বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সিন্ডিকেটের কৌশলী তৎপরতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।

চলমান এই সংকট মোকাবিলায় কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে- ১) টোকেনভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা- প্রতি পাম্পে সাপ্তাহিক সরবরাহ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক টোকেন ইস্যু নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী তেল বিতরণ ২) জ্বালানি ব্যবহারের খাতভিত্তিক বিভাজন- পেট্রোল: মোটরসাইকেল ও জরুরি জেনারেটর, অকটেন: প্রাইভেট গাড়ি, ডিজেল: পরিবহন ও কৃষি, ৩। সর্বোপরি ফুয়েল কার্ড চালু করা। জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে ফুয়েল কার্ড ইস্যু করা, অপব্যবহার ও অতিরিক্ত মজুদ কমানো। ৪) জরুরি সেবার জন্য সংরক্ষিত লেন- মোট সরবরাহের একটি অংশ অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসা ও জরুরি সেবার জন্য বরাদ্দ রাখা, মনস্তাত্ত্বিক চাপ বা পিনিক- সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো ‘প্যানিক বাইং’ বা পিনিক ওঠা। মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুদ করছে, ফলে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

একটি পাম্পে একদিনে যে পরিমাণ তেল বিক্রি হওয়ার কথা, তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে- এতে প্রকৃত প্রয়োজনের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। শহরাঞ্চলে তুলনামূলক সরবরাহ থাকলেও গ্রামীণ এলাকায় তীব্র সংকট দেখা যাচ্ছে। এর ফলে- সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, মাছের ঘের পরিচালনায় সমস্যা ও কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি- প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং (ডিজিটাল ট্র্যাকিং), কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অপ্রয়োজনীয় যান ব্যবহার কমানো সবশেষে সাতক্ষীরার জ্বালানি সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- কোনো সংকট একক কারণে তৈরি হয় না, এবং এর সমাধানও একমুখী হতে পারে না। সরবরাহ বৃদ্ধি, সঠিক বণ্টন, কঠোর তদারকি এবং জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ- এই চারটি স্তম্ভের সমন্বিত প্রয়োগই পারে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে। এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন, যাতে ভবিষ্যতে এমন সংকট আর না ফিরে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *