ইতিহাস নিয়ে সবারই রয়েছে কৌতূহল। বিশেষ করে সেকালের রাজা ও রানীদের নিয়ে কৌতূহলতা সবার মনেই রয়েছে বৈ-কি! ইতিহাস ঘাঁটলেই ক্লিওপেট্রা, এলিজাবেথ, মেরিসহ বিখ্যাত নারীর কথা সামনে আসে। নিজেদের কৃতকর্মের জন্যই ইতিহাসের বুকে স্থান পেয়েছেন তারা।
এছাড়া নিজেদের সৌন্দর্য দিয়েও আজো বিশ্ববাসীকে আকর্ষিত করছেন তারা। বর্তমান নারীরা তাদেরই সৌন্দর্য্য রহস্য অনুসরণ করে থাকে। তবে জানেন কি? কতোটা অদ্ভুত আর ভয়াবহ ছিল তাদের রূপচর্চার ধরন। সৌন্দর্য চর্চার জন্য তারা নিজেদের বলিদান পর্যন্ত করেছেন! চলুন তবে জেনে নিন ইতিহাসের সেরা সুন্দরী রানীদের রূপের গোপন রহস্য-

উত্তর ইতালির এ রানী ছিলেন বত্তিচেল্লিসহ ফ্লোরেন্সের অনেক চিত্রশিল্পীর চিত্রের মডেল। এমনকি বত্তিচেল্লির ১৪৮০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় ‘দ্য বার্থ অব ভেনাস’ চিত্রকর্মে মাঝখানে থাকা নারীই স্বয়ং ভেসপুচ্চি। তখনকার সময়ে কেউ চিত্রকর্মের মডেল হবে এটা ভাবতেই পারত না। তবে ভেসপুচ্চি তার সৌন্দর্যের জন্য এতোটাই বিখ্যাত ছিলেন যে অন্যরা তাকে অন্ধ অনুকরণ করতে থাকেন। এমনকি সে সময়কার সেরা সুন্দরীও মানা হয় ভেসপুচ্চিকে। ভেসপুচ্চি চেহারাকে ধূসর, সাদা ও আরো সৌন্দর্যময় করে তুলতে মুখে জোঁক লাগিয়ে রাখতেন।

জোঁকেরা মুখ থেকে রক্ত চুষে নিতো। ফলে রক্তহীনতায় মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যেত। আর এটাই ছিল সে সময়কার নারীদের ফর্সা হওয়ার সহস্য। যারা জোঁক ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন না, তারা পাউরুটির টুকরো, ডিমের সাদা অংশ ও ভিনেগার একত্রে মিশিয়ে ফেস মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করতেন। জন্মগতভাবেই ভেসপুচ্চি ছিলেন স্বর্ণকেশী। তার দেখাদেখি অন্য অনেকেই নিজেদের চুলকে সোনালী রঙের বানাতে চাইতেন। তবে নিজেদের চুলকে সেভাবে সজ্জিত করার মতো অর্থ যাদের থাকত না তাদের ভরসা ছিল নিজেদের মূত্র। মাত্র ২২ বছর বয়সেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই সুন্দরী রানী।

এই নারীকে বলা হয়ে থাকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম সেরা সুন্দরী সম্রাজ্ঞী। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, জো যখন তরুণী ছিলেন তখন নাকি তিনি দেখতে ততটা আকর্ষণীয় ছিলেন না। তবে ৬০ বছর বয়সে নাকি তিনি হয়ে উঠেছিলেন ১৬ বছরের ন্যায় সুন্দরী। জানেন কি, এ অসম্ভবকে সম্ভব করতে তিনি কী করেছিলেন? কথায় বলে টাকা থাকলে বাঘের দুধও কিনতে পাওয়া যায়। ঠিক তাই যেন ঘটিয়েছিলেন এই নারী। সম্রাজ্ঞী হবার পরে শুধুমাত্র তার রুপচর্চার উদ্দেশ্যেই রাজপ্রাসাদের ভেতরে একটি আস্ত কসমেটিক্সের গবেষণাগার গড়ে তুলেন জো। গবেষণাগারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলো যেমন দামী ছিল তেমনই উৎপাদিত প্রসাধনী সামগ্রীও ছিল বেশ ব্যয়বহুল। সেই পণ্যগুলোর একমাত্র ক্রেতা ছিলেন জো নিজেই।

পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের কন্যা লুক্রেজিয়া বর্জিয়া ছিলেন বিখ্যাত হাউজ অব বর্জিয়ার এক অভিজাত বংশীয় নারী। মোহনীয় রূপের জন্য অসংখ্য চিত্রকর্ম উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে তাকে। বর্জিয়ার রূপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তার চুল। এই নারী তার চুল পরিচর্যাই ২৪ ঘণ্টা পার করতেন। বর্জিয়ার চুল ছিল বেশ উজ্জ্বল ও সোনালী বর্ণের। তবে এটি তিনি জন্মগতভাবে পাননি। তার পরিবারের অন্য সবার চুলের মতো তারও ছিল ঘন কালো চুল। যা বর্জিয়া একদমই পছন্দ করতেন না। তার পছন্দ ছিল সূর্যের আলোয় চকচক করে ওঠা সোনালী চুল। এজন্য লেবুর রস ও এক ধরনের ক্ষারের সাহায্যে নিজের চুল কয়েক ঘণ্টা সময় লাগিয়ে ধুতেন তিনি। এরপর দিনের বাকি সময় ধরে আবার সূর্যের আলোতেই চুল শুকাতেন বর্জিয়া। চুলের পরিচর্যার কারণে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাতিল করতেন এই সুন্দরী।

ফর্সা হতে যুগে যুগে নারীরা কত কিছুই না করেছেন! রানী প্রথম এলিজাবেথের সময়েও ছিল নারীদের ফর্সা হওয়ার ঝোঁক। সে সময়কালে সর্বাধিক জনপ্রিয় প্রসাধনী সামগ্রীটির নাম ছিল ভেনেশিয়ান সেরুজ। যেটি সীসা ও ভিনেগার মিশিয়ে প্রস্তুতকৃত একটি প্রসাধনী। তৎকালীন নারীরা নিজেদেরকে আরো ফর্সা দেখাতে এটি মুখে ব্যবহার করতেন। ভেনেশিয়ান সেরুজ ব্যবহারের দিক দিয়ে ততকালীন অন্য সব নারীকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন রানী নিজেই। তার বয়স যখন ২৯ বছর, তখন তিনি সুলপক্সে আক্রান্ত হন। ফলে তার সারা শরীর গুটি গুটি দাগে ছেয়ে যায়। এ অবস্থায় কারো সামনে যাবার মতো অবস্থা ছিল না রানীর। তাই জনসমক্ষে যাবার আগে প্রতিবার তিনি শরীরের বাইরে প্রদর্শিত প্রতিটি অংশ ভেনেশিয়ান সেরুজ মাখিয়ে অতঃপর মেকআপ করতেন।

রানী মেরি জন্মগতভাবে ততটা সুন্দরী ছিলেন না। কারণ তার নাকটা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা লম্বাটে। তার শখ ছিল মোহনীয় রূপের অধিকারী হতেই হবে। নিজের চেহারাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে হোয়াইট ওয়াইন দিয়ে পূর্ণ বাথটবে গা ভেজাতেন তিনি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, ওয়াইনের মাধ্যমে রূপচর্চা এখনো বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রচলিত রয়েছে। যা ভাইনা থেরাপি নামে পরিচিত।

ফ্রান্সের সর্বশেষ রানী। এই রানীর সৌন্দর্যের ছিল গোপন রহস্য। তিনি ঘুমাতে যাবার আগে ফেসমাস্ক ব্যবহার করতেন। আর ফেসমাস্কের উপকরণ কি ছিল জানেন? উপকরণগুলোর নাম শুনে কেউ সেটাকে খাবার বলে ভাবলেও খুব একটা ভুল হবে না। কারণ সেই মিশ্রণে থাকত কনইয়াক মদ, ডিম, গুঁড়া দুধ এবং লেবুর রস। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে রানী যে ফেস ক্লিনার ব্যবহার করতেন তা তৈরি করা হতো কবুতর সিদ্ধ পানি দিয়ে। এ বোতলগুলোর লেবেলে লেখা থাকত ইয়াউ কসমেটিক ডি পিজন। সেখানে আরো লেখা থাকত প্রতিটি বোতলের মিশ্রণ তৈরিতে ৮টি করে কবুতর ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়াও মেরি আঁতোয়ানে দিনে তিনবার পোশাক বদল করতেন।

এমনকি তাকে এক পোশাকে দ্বিতীয়বার কখনোই দেখা যেত না। ধারণা করা হয়, রানীর পোশাকের জন্য বছরে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হতো, তার বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। সেসময় ফ্রান্সে শরীরের চামড়ার উপরে দৃশ্যমান রক্তের শিরাকে নীল রঙে রাঙানো হত। তখনকার জনপ্রিয় এই ফ্যাশনের অনুসারীও ছিলেন রানী মেরি। তখন ফ্রান্সের নারীদের মাঝে কে কতটা কৃশকায় হতে পারে তাও একটা ফ্যাশনে রূপ নিয়েছিল। তারা নিজেদের শিরাগুলোকে নীল রঙের পেন্সিল দিয়ে আঁকতেন। এর মাধমে নিজেদেরকে মেদহীন ও আকর্ষণীয় দেখানোর চেষ্টা করা হত। এ সবই পুরুষদের আকৃষ্ট করার জন্য তারা করতেন।

মিশরের রানী নেফারতিতি ছিলেন অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী। যদিও তার নামের অর্থ ছিল সৌন্দর্যের আগমন। এই নারী নিজের রুপচর্চার জন্য প্রচুর অর্থ ও সময় ব্যয় করতেন। তা নিয়ে রয়েছে নানা গল্পও। জানেন কি? নেফারতিতির মাথায় কোনো চুলই ছিল না। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেহের পুরো চুলই কামিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। চুলের জায়গায় তিনি পরচুলা ব্যবহার করতেন। আর চোখে ব্যবহার করতেন সীসার আকরিক গ্যালেনা থেকে প্রস্তুতকৃত সুর্মা। নেফারতিতি যে লিপস্টিক ব্যবহার করতেন, সেটার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হত বিষাক্ত ব্রোমিন ম্যানাইট। যা তার স্বাস্থ্যহানীর জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়।