বর্তমান উন্নত বিশ্বে সব জিনিস খুব সহজে লাভ করা যায়। বিভিন্ন আসবাব, উপকরণের সহজলব্ধতা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নিত্য নতুন আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে কোনো জিনিসের প্রাপ্তি অর্জনে মানুষের কোনো সমস্যাতেই পড়তে হয় না। এতদসত্তেও গভীরভাবে চিন্তা করলে যে জিনিসটা খুব সহজে পাওয়া যায় না তা হলো মানবতা। যা ধীরে ধীরে লুপ্ত হতে চলছে।
পরিস্থিতি এই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আমরা মানুষেরাই বরং এ পৃথিবীতে মানবতাকে গলা টিপে হত্যা করে দিয়েছি, শুধু দাফন করতে ভুলে গেছি। এজন্য আজ মানবতা এক লাওয়ারিশ লাশের মতো পড়ে আছে। অপরদিকে পশুরূপী মানুষেরা নিজেদের চেহারায় মানবতার লেবাস লাগাচ্ছে, অথচ তারাই নিরাপরাধ লোকদেরকে হত্যার নিশানা বানাচ্ছে।

পশুর আকৃতি দেখেই চেনা যায়, এই হচ্ছে সিংহ, এই হচ্ছে বাঘ আর এই হচ্ছে গাধা। কিন্তু মানুষরুপী পশুদের চেনা যায় না তারা আসলে কোন জাতের পশু। মানুষরুপী এই পশুরা মানুষের মাঝে নানা অপকর্ম করে চলছে। তাদের হিংস্র থাবা থেকে ছোট বাচ্চাও আশংকামুক্ত থাকতে পারছে না। একজন নারী তার চলার অধিকার, নিজের ইজ্জত-আব্রু নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার পাচ্ছে না এই মানুষরুপী পশুদের কারণে। তাদের কামনা আর লালসার শিকারে পরিণত হচ্ছে নারীরা।

ইভটিজিং, ধর্ষণ তারপর হত্যা পর্যন্ত করে ফেলে ওই পশুরা, একটুও বুক কাঁপে না। আমার তো বলতে ইচ্ছে হয়, মানুষরুপী এই পশুদের তুলনায় পশুরাই উত্তম। পশুরাতো কোনো দিন নিজেদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব দাবি করে নাই, অথচ এই মানুষরাই নিজেদের আশরাফুল মাখলুকাত দাবি করে অথচ কাজ করে নিকৃষ্ট। পশুদের কোনো বিবেক, অনুভূতি নেই, এতদসত্তেও এরা নিজেদের ছোট বাচ্চাদেরকে ধর্ষণ করে না। পশুরা নিজেদের নারী পশুদের সঙ্গে মিলনে লিপ্ত হয় কিন্তু হত্যা তো করে না।

ধর্ষণ-খুনে মাতৃভূমির করুণ অবস্থা: আজকাল ধর্ষণ-খুনের মহড়ায় আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের অবস্থা খুবই নাজুক। আমাদের প্রিয় মা-বোনদের ইজ্জত-আব্রুর সংরক্ষণ একটি বড় সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। নারী ধর্ষণ, হত্যার নিউজ প্রত্যেকদিন চোখে পড়ছে সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। এধরণের অনেক ঘটনা দমনে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জোড়ালো ভূমিকা রয়েছে। অপরাধীদের ধরে শাস্তিও প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু অপরাধ দমনে এসব কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি? এইতো সেদিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনাটি পুরো জাতিকে মারাত্মক আহত করেছে। বিভিন্ন রাজপথে এ নিয়ে মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন হয়েছে। প্রতিবাদকারী জনতা অপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

যে কোনো ধর্মেরই হোক না কেন, মানুষ হিসেবে প্রত্যেক নারী সম্মানের পাত্র। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মাদ (সা.) অমুসলিম নারীদের সঙ্গেও সদাচরণ করার শিক্ষা দিয়েছেন। ইসলামের ইতিহাসে এরকম ঘটনা অজানা নয় কারো। হজরত আলী (রাযি.) ইয়ামানের গভর্নর ছিলেন। সেসময় তিনি অনেক বিদ্রোহ দমন করেন এবং অনেক অপরাধীকে বন্দি করে মদীনায় পাঠান। বন্দিদের মধ্যে আদি এর বোন সাফ্ফানা বিনতে হাতেম নামে এক অমুসলিম নারীও ছিল। সেও যখন রাসূল (সা.) এর দরবারে উপস্থিত হলো, তখন সে জানালো, ‘আমি বিশিষ্ট দানবীর হাতেম তাঈ এর কন্যা। আমার বাবা ক্ষুধার্তদের আহার দিতেন। গরীবদের প্রতি দয়া করতেন।’ উত্তরে নবী করিম (সা.) বললেন, ‘তোমার বাবা মুসলমানদের প্রতি ভালো আচরণকারী ছিলো।’ আদি এর বোন তখন আরজ করলো, ‘আপনার কাছে আমার একটি বিশেষ আবেদন, যা কবুল করে আমাকে কৃতজ্ঞার সুযোগ করে দেবেন।’ নবী করিম (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি সেই আবেদন?’ আদি এর বোন বললো, ‘আমার বাবা ইন্তেকাল করে চলে গেছেন। আপনি আমার প্রতি দয়া করুন অর্থাৎ আমাকে আজাদ করে দিন, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। আমার রক্ষণাবেক্ষণকারী অর্থাৎ আমার ভাই পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। আপনার সৈন্যদের ভয়ে তিনি শাম অঞ্চলে পালিয়ে গেছেন। আপনি আমাকে অনুমতি দিন, যাতে আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে আসব এবং আপনি আমার ভায়ের জন্য নিরাপত্তানামা লিখে দেবেন।’

হুজুর (সা.) তার কথা শুনে কিছু না বলে চুপচাপ চলে গেলেন। দ্বিতীয় দিন হুজুর (সা.) বন্দিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আদি এর বোন পুণরায় ওই আবেদন করলো। হুজুর (সা.) বললেন, ‘তুমি এতো তাড়াহুড়ো করছো কেন। যখন তোমার এলাকা থেকে এমন কেউ এখানে আসে, যার ওপর তোমার ভরসা থাকবে, তার সঙ্গে তুমি চলে যাবে।’

কিছু দিন পর আদি এর বোনের আত্মীয়দের থেকে কিছু ব্যক্তি মদিনায় এলো। আদি এর বোন বলেন, ‘আমি হুজুর (সা.)-কে (লোক মারফত) অবগত করলাম, আমার আত্মীয়দের থেকে এমন কয়েকজন ব্যক্তি এসেছেন, যাদের ওপর আমার ভরসা আছে। এ কথা শোনার পর হুজুর (সা.) আমার জন্য এক জোড়া জামা পাঠালেন এবং আমার পাথেয় আর সওয়ারিরও ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি আমার আত্মীয়দের সঙ্গে নিরাপদে, সুন্দরভাবে আমার ভাইয়ের কাছে পৌঁছে গেলাম।’

এটাই হলো ইসলামের মানবাধিকার, যা একজন অমুসলিম নারীর সঙ্গে ধর্মীয় পার্থক্য না করেই উত্তম আচরণ করার অনন্য দৃষ্টান্ত।
গভীরভাবে চিন্তার বিষয় হলো, সমস্যা শুধু একজন শিক্ষার্থীর সামাজিক মর্যাদা নিয়ে নয়, বরং এরকম হাজারো নিষ্পাপ জানের মান-মর্যাদা আর জীবন নিয়ে বড় শংকায় কাটাতে হয়।

কারণ ও প্রতিকার: আজ থেকে অর্ধ শতক আগে এদেশে সামাজিক এতো অধঃপতন ছিল না। নিরাপত্তার পরিবেশ ছিল। কোনো ভয়, শংকা ছাড়াই একজন অমুসলিম প্রতিবেশীও তার স্ত্রী, কন্যা, বোনদেরকে মুসলিম প্রতিবেশীর ঘরে রেখে যেত, এতে তার কোনো রকমের আশংকাই জাগতো না। কিন্তু যখন থেকে যুগের উন্নতি শুরু হয়েছে, তখন থেকে সামাজিক অধঃপতনও শুরু হয়েছে। সেসময়ে মানুষ অশ্লীল-অপকর্মকে ব্যক্তিক, সামাজিকভাবে প্রচণ্ড ঘৃণা করতো। আজ উন্নত প্রযুক্তির এই দুনিয়ায় মানুষের কাছে অপকর্ম করা একেবারেই সহজ হয়ে গেছে এবং কোনো অপকর্ম, অশ্লীলতাকে মানুষ লজ্জাই মনে করছে না। আজ যে যতটা উলঙ্গ হয় তাকে ততোটা আধুনিক ভাবা হচ্ছে! পর্দাবৃত থাকাকে প্রগতি বিরোধী ভাবা হচ্ছে!

তরুণ সমাজ আজ ইন্টারনেটের দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকছে। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ ইন্টারনেটের খারাপ সাইটগুলোতে তরুণ-তরুণীর আসক্তি বাড়ছে দিন দিন। অপরদিকে নাটক-সিনেমার অশ্লীলতা যেন বাস্তবিক জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে। নর-নারী, যুবক-বৃদ্ধ, বালক-বালিকা, গরীব-ধনী সবাই যেন আজ সিনেমা পাগল। অথচ চার-পাঁচ দশক আগেও সিনেমা দেখাকে মানুষ লজ্জাকর বলে মনে করতো।

আমাদের নিকট অতীতের সমাজে ছিল যৌথ পরিবার বা জয়েন্ট ফ্যামিলি। ফ্যামিলির প্রত্যেক সদস্য মুরব্বিদের তত্ত্ববধানে থাকতো। চলনে বলনে প্রত্যেক কাজে-কর্মে পরিবারের মূল পরিচালকের কাছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হওয়া লাগতো। যার ফলে পরিবারের কোনো সদস্য অপরাধ করার সাহস পেত না। আর এখনকার যুগে হলো নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। এতে ফ্যামিলির প্রত্যেক সদস্য থাকে পৃথক পৃথক। কারো কাছে কোনো সদস্যের জবাবদিহিতা নেই। এমনকি সন্তানদের এভাবে ফ্রি ছেড়ে দেয়া হয় যে, তারা কোথায় কি অপরাধ করে বেড়াচ্ছে তা নিয়ে অভিভাবকদের কোনো দায়িত্বশীল মনোভাব নেই।

অপরদিকে যেসব ছাত্রীরা শালীনধর্মী পোশাক পরে, আমাদের কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। নানা বিদ্রুপাত্মক আচরণ চলে তাদের ওপর। কোথাও কোথাও তো বোরকা খুলে ক্লাস করতে বাধ্য করা হয়। মেয়েরা যেখানে শালীন হবে, সেখানে তাদের অশালীনভাবে চলাফেরা করতে বাধ্য করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের অন্যান্য সেক্টরে নারীদের আলাদাভাবে থাকবার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমন চরম পরিবেশে শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে আশ্চর্য হবার কী আছে!

ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদের প্রত্যেক পুরুষের দায়িত্ব হচ্ছে নিজের ভেতর আল্লাহর ভয় রাখা। এজন্য শুধু কাউকে শাস্তি প্রদান করলেই ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির প্রতিকার করা যায় না বরং প্রত্যেকের ভেতরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত রাখা। সে সঙ্গে পিতা-মাতারও দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের সন্তানদের ভালোভাবে তত্ত্বাবধান করা। তাদের প্রতি যত্মবান থাকা এবং তাদেরকে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া। বিশেষ করে সন্তান উপযুক্ত হয়ে গেলে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা। এ কথা স্মরণ রাখা দরকার, যেমনিভাবে ক্ষুধা লাগলে খাবার গ্রহণ করাই প্রধান কর্তব্য, তেমনিভাবে বালেগ হলে বিয়ে করাই প্রত্যেক নর-নারীর প্রধান কর্তব্য। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত সন্তানদের বিয়ে করিয়ে দেয়া। বিয়েকে সহজতর করে সন্তানের চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা। তবেই সমাজ হতে শ্লীলতাহানির মতো অপকর্মের মূলোৎপাট হবে এবং সমাজ পবিত্র, স্বচ্ছ ও নিরাপদময় হবে।