প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস জনিত কারণে বিশ্বব্যাপী করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল চলছে। যার ফলে বিশ্বব্যাপী লকডাউন চলছে তার ফলে সকল প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস আদালত, শিল্প কলকারখানা, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডসহ জন যানবাহন বন্ধ আছে। মানুষ বাইরে বের হতে পারছেনা। এর ফলে বিশ^ অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসছে যার সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ও প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি মুলত তিনটি খাতের উপর নির্ভরশীল যথা- কৃষি, শিল্প ও সেবা । কৃষি খাত আবার তিনটি খাতে বিভক্ত যথা- কৃষি কাজ, প্রানী সম্পদ পালন ও মৎস্যচাষ। শিল্প খাতের মধ্যে অন্যতম তৈরি পোশাক খাত। বর্তমানে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে কমবেশি ৪০ লক্ষ মানুষ কর্মে নিয়োজিত আছে।

বাংলাদেশের বাৎসরিক মোট বৈদেশিক আয় কমবেশি ৩২০ কোটি ইউএসডলার তার মধ্যে ৮৩ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত হতে। ধারনা করা হচ্ছে করোনা ভাইরাস সংকট উত্তরণের পরপরই বিদেশীরা তৈরি পোশাকের প্রতি চাহিদা কমিয়ে নিয়ে আসবে যার ফলে বাংলাদেশের ৫৮ শতাংশ তৈরি পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বিদেশীরা রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সক্ষমতা নিয়ে আসার প্রস্তুতি হিসেবে পোশাকের থেকে খাদ্য ও ওষুধের প্রতি বেশি গুরুত্ব প্রদান করবে। যার ফলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের কমবেশি ৪০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ২০ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হবে এবং বিশ^ব্যাপী ৩৩০ কোটি চাকুরীজীবী মানুষের মধ্যে ১৬০ কোটি মানুষ চাকুরী হারাবে কারণ চাকুরীর নিশ্চয়তা নেই, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা না থাকা ও গৃহ ভিত্তিক কাজের অভাব (আইএলও)।

অন্যদিকে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিং (এসএএনইএম) গবেষণা প্রতিবেদন মতে ২০০৫ সালে দারিদ্র্যতার হার ছিল ২০.৫ শতাংশ তবে কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ফলে বাংলাদেশ ১৫ বছর পিছিয়ে যাবে যার ফলে দারিদ্র্যতার হার আসবে ৪০.৯ শতাংশে যেটি আমাদের জন্য খুবই চিন্তার বিষয় হবে।

বর্তমানে আমরা সকলে গৃহ বন্ধি অবস্থায় আছি তবে গভীর অপেক্ষায় আছি কবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে আমরা আবার সেই সকলের স্ব স্ব চিরচেনা পরিচিত কর্মস্থানে যেতে পারবো এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের মত করে ঘুরতে পারবো।

তবে আমরা আশাবাদী সেই দিন খুবই শিঘ্রই ফিরে আসবে। তবে সে সময়ে আমাদের সকলকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির চাকাকে চাঙ্গা করে তুলতে হবে। আর বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা চাঙ্গা রাখার জন্য কৃষির উপর বেশি বেশি জোর দিতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন হবে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনী উদ্যোগ।

কৃষকের কোন আবাদি জমি যাতে পড়ে না থাকে এবং শস্যাবর্তন করে শস্য ফলানো যায় তার জন্য বিশেষ নজর দিতে হবে। এ জন্য কৃষকের দরকার হবে উদ্ভাবনী মূলক প্রশিক্ষণ ও টেকসই উন্নত প্রযুক্তি।

যদিও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কমবেশি ৭ কোটি মানুষের ঘরে ঘরে খাবারের অভাব ছিল সেখানে আজ জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হলে খাদ্যের ঘাটতি কমিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদন করা সম্ভবপর হয়েছে যার অবদান শুধু মাত্র কৃষি ও কৃষির সাথে জড়িত সকলের প্রচেষ্টা।

তবে উল্লেখ্য যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কিন্তু কৃষি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি বরং প্রতিবছর চাষযোগ্য জমিতে বসতি গড়ে তোলা, ভূমি ক্ষয়, নদী ভাঙন ইত্যাদি কারণে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে।

কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র কৃষি ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের অভাবনীয় অবদানের জন্য তার পরেও সকল পর্যায়ের তথা গ্রাম পর্যায়ের কৃষকদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাদেরকে উপয্ক্তু পরিকল্পনা করে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হবে। তবে মানানসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন একান্ত দরকার।

কৃষিচাষ: কৃষিচাষাবাদের ক্ষেত্রে কৃষককে শস্যাবর্তন পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে একই জমিতে যাতে একাধিকবার সমন্বিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

বিভিন্ন স্বল্প মেয়াদী যে সকল অধিক ফলনশীন শস্য আছে সেগুলোর আবাদ বেশি বেশি করে করতে হবে। কৃষকের প্রতিটি আবাদি জমি, ঘেরের আইল ও বাড়ির আঙিনায় কৃষি অফিসের উদ্ভাবিত বিভিন্ন পন্থা অনুসরণ করে শস্য চাষ করতে হবে। কৃষকের বাড়ির আঙিনায় মাচা পদ্ধতিসহ অন্যান্য উন্নত পদ্ধতিতে শস্য উৎপাদন করতে হবে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১৯ টি জেলা উপকূলবর্তী যেখানে অধিকাংশ এলাকায় লবণাক্ততা আছে যেখানে স্বাভাবিকভাবে চাষাবাদ করা যায়না তাই সেই সকল এলাকায় বিভিন্ন লবণসহশীল জাত উৎপাদন করতে হবে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উৎপাদনসহ সকল কৃষকের কাছে পৌছে যাবে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

শস্য উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ যথাযথভাবে করতে হবে । তবে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রবণ দেশ সে দিকে খেয়াল রেখে যথাযথভাবে শস্য উৎপাদন করতে হবে।

মৎস্য চাষ: বাংলাদেশের মৎস্য সেক্টরের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশের চিংড়ি বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান আছে। এ জন্য মৎস্য চাষীদের আধুনিক ও উন্নত পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ করতে হবে।

বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকে সেই সকল জলাবদ্ধতা এল্কাায় সকল কৃষক সমবায় পদ্ধতিতে বা খাঁচা পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ করতে হবে। অনেক জলমহল পতিত অবস্থায় থাকে সেগুলো যথাযথ পদ্ধতি অনুসরন করে মৎস্য চাষের আওয়াতায় নিয়ে আসতে হবে।

মৎস্য উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কৃষকদের যথাযথ জ্ঞানবৃদ্ধিসহ ফসল সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে মৎস্য অফিসের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতি অনুশীলনের মাধ্যমে অধিক উৎপাদন সম্ভব যেটির ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আরো বেশি বেশি পরিমানে বাইরের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

প্রাণী সম্পদ পালন: প্রাণী সম্পদের উৎপাদনও যথাযথভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে খামারী পর্যায়ে ও গৃহ পর্যায়ে প্রাণী সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। খামারী পর্যায়ে যেমন হাঁস পালন, মুরগী পালন, গাভী পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল পালন, কবুতর পালন ও কোয়েলসহ অন্যান্য প্রাণী পালন করা যায় তেমনিভাবে গৃহ পর্যায়েও এগুলো পালন করা যায়।

এক্ষেত্রে পরিববারের নারী ও পুরুষসহ সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে এবং সমন্বিতভাবে এর পালন বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা প্রাণীজ সম্পদের যথাযথ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশিয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রাপ্তানি করতে পারি যেটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখতে পারবে।

বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য কৃষি সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বৃদ্ধিসহ স্ব স্ব ক্ষেত্রের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইন ও ভ্যেলু চেইন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সুশাসন নিশ্চিত একান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত সকল প্রকারের কৃষি প্রণোদনা যাতে যথাযথভাবে যথাযথ কৃষকের নিকট পৌছায় তার জন্য সকলকে সতর্কতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে। আমরা জানি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৪ শতাংশের মতো তবে আমাদের বিশ্বাস এই কৃষিই আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাড়াতে অবদান রাখবে।

আমারা জানি আমাদের সম্পদ সীমিত তবে আমাদের সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য এখন থেকেই আমাদের সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি পোষাক খাতে যদি ও শিথিলতা নেমে আসে তাহলে আমরা আমাদের কৃষিজ সম্পদের যথাযথ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা আমাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সক্ষম হবো।

…………………………………………………………………….

মৃনাল কুমার সরকার, উন্নয়নকর্মী