অনলাইন ডেস্ক : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মহামারি করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)। ফলে ভাইরাসটিতে মোট ৫৫৯ জন মারা গেলেন। একই সময়ে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরো দুই হাজার ২৯ জন। ফলে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৩২১ জনে। ২৪ ঘণ্টায় ৫৪০৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাভাইরাস বিষয়ক নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানান অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মহাপরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা।

তিনি সবাইকে স্বাস্থ্য পরামর্শ মেনে ঘরে থাকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণেরও পরামর্শ দেন। একই সাথে যারা করোনার এই মহামারিতে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদের ধন্যবাদ দেন নাসিমা।

এর আগে বুধবারের (২৭ মে) বুলেটিনে জানানো হয়, দেশে চব্বিশ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরো ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫৪৪ জন। এই সময়ে করোনা শনাক্ত করা হয়েছে ১ হাজার ৫৪১ জনের শরীরে। ফলে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ২৯২ জনে।

বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাভাইরাস বিষয়ক নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে সবাইকে স্বাস্থ্য পরামর্শ মেনে ঘরে থাকার আহ্বানসহ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

একই সাথে যারা করোনার এই মহামারিতে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদের ধন্যবাদ জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মহাপরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা।

বুলেটিনে জানানো হয়, বুধবার চব্বিশ ঘণ্টায় ৩৪৬ জনসহ মোট সুস্থ হয়েছেন ৭ হাজার ৯২৫ জন। চব্বিশ ঘণ্টায় পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৯.২২ শতাংশ। দেশে শনাক্তের বিবেচনায় সুস্থতার হার ২০.৭০ শতাংশ; মৃত্যু হার ১.৪২ শতাংশ।

সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করা ২২ জনে পুরুষ ২০ জন, নারী দু’জন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১০ জন (ঢাকা শহরের পাঁচজন), চট্টগ্রাম বিভাগের ১০ জন এবং সিলেট বিভাগের দুজন। হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের এবং এক জনের মৃত্যু হয়েছে বাসায়।

বুলেটিনে বলা হয়, বয়স বিবেচনায় ০-১০ বছরের মধ্যে একজন, ২১-৩০ বছরের মধ্যে দুজন, ৩১-৪০ বছরের মধ্যে দুজন, ৪১-৫০ বছরের মধ্যে সাতজন, ৫১-৬০ বছরের মধ্যে সাতজন এবং ৭১-৮০ বছরের মধ্যে একজন।

বুলেটিনে আরো বলা হয়, দেশের ৪৮টি ল্যাবে চব্বিশ ঘণ্টায় মোট ৭ হাজার ৮৪৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, আগের দিনের নমুনাসহ পরীক্ষা করা হয়েছে ৮ হাজার ১৫টি নমুনা। চব্বিশ ঘণ্টায় আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছিল ২৮১ জনকে; ছাড় পেয়েছেন ৫৭ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ৪ হাজার ৯৯৪ জন।

গত একদিনে কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে ২ হাজার ৭৮৯ জনকে। আর ছাড় পেয়েছেন ২ হাজার ৮২ জন। বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৫৬ হাজার ৬৯৬ জন।

প্রসঙ্গত, চীনের উহান থেকে বিস্তার শুরু করে গত চার মাসে বিশ্বের ২১২টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)। চীনে করোনার প্রভাব কমলেও বিশ্বের অন্য কয়েকটি দেশে মহামারি রূপ নিয়েছে।

এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫৬ লাখ ছুঁইছুঁই। মারা গেছেন তিন লাখ ৪৭ হাজারেরও বেশি মানুষ। তবে ২৩ লাখ ৬৮ হাজারেরও বেশি রোগী ইতিমধ্যে সুস্থ হয়েছেন।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নেয়া হয়েছে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। অধিকাংশ দেশেই মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করতে মানুষের চলাফেরার ওপর বিভিন্ন মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। কোনো

কোনো দেশে আরোপ করা হয়েছে সম্পূর্ণ লকডাউন, কোথাও কোথাও আংশিকভাবে চলছে মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম। এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ চলাফেরার ক্ষেত্রে কোনো না কোনো মাত্রায় নিষেধাজ্ঞার ওপর পড়েছেন।

বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর প্রথম দিকে কয়েকজন করে নতুন আক্রান্ত রোগীর খবর মিললেও এপ্রিলের শুরু থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এ সংখ্যা।

প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্নস্থানে মানুষে মানুষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, মানুষকে ঘরে রাখতে রাজপথের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় টহল দিচ্ছে সশস্ত্র বাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ। তবে, আগামী ৩১ মে থেকে সীমিত পরিসরে গণপরিবহন চলবে এবং অফিস খুলছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারী ছাড়া ১৫ জুন পর্যন্ত সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিস করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, উক্ত নিষেধাজ্ঞাকালে কেউ কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবে না। উক্ত সময়ে শর্তসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত বিধি নিশ্চিত করে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও রেল চলাচল করতে পারবে।

তবে সর্বাবস্থায় মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে। প্লেন চলাচলেও বিধিনিষেধ তুলে দেয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে আরো বলা বলা হয়, উড়োজাহাজ কর্তৃপক্ষ নিজ ব্যবস্থাপনায় প্লেন চলাচলের বিষয় বিবেচনা করবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের আওতাধীন সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

বুধবার প্রথমে অবশ্যই সিদ্ধান্ত হয়েছিল ছুটি না বাড়িয়ে সীমিত আকারে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত এবং শিল্প-কলকারখানা খুলে দিলেও গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এখন সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত হলো, ৩১ মে থেকে সীমিত আকারে সীমিত যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও ট্রেনও চলবে।

গতকাল রাতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন এই নির্দেশনা দিয়েছেন। গণপরিবহনে কতজন যাত্রী চলবে, তা ঠিক করবে স্থানীয় প্রশাসন।

এর আগে বুধবার বিকেলে সিদ্ধান্ত হয়, সরকারি ছুটি আর বাড়ছে না। সীমিত আকারে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত এবং শিল্প-কলকারখানা খুলে দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। তখনই বলা হয়েছিল গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকছে।

অবশ্য কর্মস্থলে যাওয়ার গাড়ি ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলতে পারবে। এ ছাড়া কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিমান চলাচল করতে পারবে। কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ রেখে অফিসে চলাচলসহ অন্যান্য বিষয়ে কী হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। ইতিমধ্যে সাত দফায় ছুটি বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বাড়ানো হয়। এক মাস রোজা শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়ে গেল দু’দিন আগে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সর্বশেষ ঘোষিত সাধারণ ছুটিও শেষ হচ্ছে তিন দিন পর, ৩০ মে। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে ছুটির বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত এল।

বুধবার বিকেলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৩০ মে ছুটি শেষ হচ্ছে। এরপর নাগরিক জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্থনৈতিক কমকাণ্ড এবং অফিস-আদালত সীমিত আকারে খুলে দেওয়া হবে।

সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ ব্যবস্থায় সীমিত আকারে খুলতে পারবে। সে ক্ষেত্রে বয়স্ক, অসুস্থ ও গর্ভবতী কর্মীরা কর্মস্থলে যাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১৩ দফা মানতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দোকানপাট, ব্যবসাকেন্দ্র আগের মতো সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে আরও কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপাতত বন্ধই থাকবে। তবে অনলাইন বা অন্যান্য ভার্চ্যুয়াল ক্লাস অব্যাহত থাকবে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আবার করোনা পরিস্থিতিও অবনতি হচ্ছে। এই চিন্তা থেকেই সীমিত আকারে সবকিছু খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

করোনাভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। এর লক্ষণ শুরু হয় জ্বর দিয়ে, সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্ট। উপসর্গগুলো হয় অনেকটা নিউমোনিয়ার মত।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে ডেকে আনতে পারে মৃত্যু।