বিশেষ প্রতিনিধি: বিদ্যমান সরকারি মৎস্য খামারসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’–এর আওতায় সাতক্ষীরায় জেলা পর্যায়ে দিনব্যাপী আঞ্চলিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জেলা মৎস্য অফিসের সভাকক্ষে আয়োজিত কর্মশালায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত প্রায় ৭০ জন মৎস্যচাষী, মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা, গবেষক এবং মৎস্য বিজ্ঞানীরা অংশ নেন।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি. এম. সেলিম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-পরিচালক বিপুল কুমার বসাক। অনুষ্ঠানের পুরো সেশনটি সঞ্চালনা করেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম।
কর্মশালার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘বিদ্যমান সরকারি মৎস্য খামারসমূহের সক্ষমতা ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মশিউর রহমান।
তিনি প্রবন্ধে বলেন, “দেশের সরকারি মৎস্য খামারগুলোকে আধুনিকায়ন করা গেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। অনেক খামারে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া, পুকুরপাড় ও বাঁধের জরাজীর্ণ অবস্থা, সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে এবং চাষীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারবেন।”
মৎস্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “সাতক্ষীরা ও খুলনা উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্যচাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট এবং প্রথাগত চাষব্যবস্থা উৎপাদনকে সীমিত করে রেখেছে। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে চাষ, উন্নত জাতের মাছ, সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—এসবই এখন সময়ের দাবি। সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।”
উপ-পরিচালক বিপুল কুমার বসাক বলেন, “মৎস্যচাষকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে হলে খামারগুলোর পরিবেশবান্ধব সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি চাষীদের প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও জোরদার করতে হবে।”
কর্মশালায় অংশ নেওয়া উদ্যোক্তা চাষী গোলাম রসুল বলেন, “সরকারি পুকুর ও ঘেরগুলো আধুনিক সুবিধা পেলে উৎপাদন বাড়বে। বিশেষ করে সোলারচালিত পানি উত্তোলন, উন্নত এয়ারেটর এবং মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলে চাষীরা আরও উৎসাহিত হবেন।”
মৎস্যচাষী আনিসুর রহমান বলেন, “অনেক সরকারি খামারে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার হয়নি। আমরা আশা করি চলমান প্রকল্পটি আমাদের স্থানীয় চাষীদের নতুন করে প্রাণবন্ত করবে এবং পেশাগত স্থিতিশীলতা আনবে।”
ঘের মালিক মনিরুজ্জামান বলেন, “খুলনা–সাতক্ষীরায় চিংড়ি ও সাদা মাছের চাষে বিশাল বাজার রয়েছে। যদি সঠিক অবকাঠামো থাকে, তবে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব।”
সফল মৎস্যচাষী মো. লিটু বলেন, “আমরা মাঠে কাজ করি কিন্তু অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য বা বৈজ্ঞানিক পরামর্শ পাই না। এই ধরনের কর্মশালা আমাদের জন্য খুবই সহায়ক। নতুন প্রযুক্তি ও রোগব্যাধি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও বেশি প্রশিক্ষণের সুযোগ চাই।”
খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক মৎস্য কর্মকর্তা বিপুল বসাক বলেন, “মৎস্যচাষে লাভবান হতে চাইলে জোনভিত্তিক পরিকল্পনা, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মানসম্মত পোনা ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি খামারগুলোকে ‘ডেমোনস্ট্রেশন হাব’ হিসেবে গড়ে তুললে সাধারণ চাষীরাও উপকৃত হবেন।”
সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. তৌফিক হাসান বলেন, “আমরা চাই সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ের মৎস্য উৎপাদন যেন সমন্বিতভাবে বাড়ে। এজন্য মাঠপর্যায়ে চাষীদের পাশে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করা হবে।”
দিনব্যাপী কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা প্রশ্নোত্তর ও মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। কর্মশালার মাধ্যমে সরকারি খামারের অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং প্রায়োগিক সমাধান নিয়ে কার্যকর নির্দেশনা তুলে ধরা হয়।







