বিশেষ প্রতিনিধি : সাতক্ষীরায় মানব পাচার প্রতিরোধে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কার্যকর সমন্বয়, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার শনাক্তকরণ ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে সিটিসি কমিটির জেলা সম্মেলন।
রূপান্তর আয়োজিত আশ্বাস প্রকল্পের আওতায় বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সকাল ১০টায় শহরের একটি হোটেলের সম্মেলন কক্ষে দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল। তিনি বলেন, “মানব পাচার এমন এক অপরাধ, যা সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের টার্গেট করে। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়—স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থা সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।”
উপ পরিচালক, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নাজমুন নাহার বলেন, *“নারী ও শিশুরা পাচারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে। পরিবার–সমাজের অজ্ঞতা এবং প্রলোভনই মূল সমস্যা। ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী-শিশুর সুরক্ষায় সচেতনতার কাজ আরও বাড়াতে হবে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ মুকিত হাসান খান বলেন, “পুলিশ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছে। সীমান্ত এলাকায় টহল বৃদ্ধি, দালাল চক্র শনাক্তকরণ এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে নেওয়ার ঘটনাগুলো প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক অভিযান নিয়মিত পরিচালনা হচ্ছে।”
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক ইকবাল হোসেন বলেন, “বিদেশে যেতে হলে বৈধ উপায়ে যাওয়ার বিষয়ে মানুষকে জানানো জরুরি। দালালদের কথায় বিদেশগমন সর্বদা শেষ পর্যন্ত প্রতারণা বা পাচারে রূপ নেয়।”
শোভনালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওঃ মোঃ আবু বকর ছিদ্দীক বলেন, ইউনিয়নে পাচার প্রতিরোধে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর তালিকা করা জরুরি।
সম্মেলনে গণমাধ্যম–মানবাধিকারকর্মী–সামাজিক নেতাদের দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। সাতক্ষীরার সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন সম্মেলনে বলেন, “মানব পাচার শুধু আইনগত নয়—এটি আমাদের মানবিক সংকট। মাঠপর্যায়ে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, দারিদ্র্য, প্রবাস স্বপ্নের অপব্যবহার এবং অজ্ঞতা—এই তিনটি কারণ পাচারচক্রকে শক্তিশালী করে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পাশাপাশি প্রশাসন ও এনজিও একসঙ্গে কাজ করলে পাচার দমন সম্ভব।”
মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত বলেন, “মানব পাচার একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। একজন মানুষ যখন প্রতারণায় পড়ে সীমান্ত পাড়ি দেয়, তখন সে শুধু শারীরিক নয়—মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনেরও শিকার হয়। ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।”
চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের প্রতিনিধি ও সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না বলেন, “পাচারকারীরা এখন অনলাইনে সক্রিয়। ‘সৌদি নিয়ে যাব’, ‘পাসপোর্ট লাগবে না’—এ ধরনের ফেসবুক বিজ্ঞাপনে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। গণমাধ্যম শুধু খবর নয়—ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
কালিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার দাস বাচ্চু বলেন, “গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত পাচারের ঘটনা এখন নানাভাবে ছড়িয়ে আছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে অনেক তথ্য তুলে আনেন কিন্তু সেগুলো সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা দরকার। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সিটিসি কমিটিগুলো আরও সক্রিয় হলে পাচার প্রতিরোধে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে।”–
সম্মেলনে ইউনিয়ন–উপজেলা থেকে ভুক্তভোগী—সবার অংশগ্রহণ ছিল স্বতস্ফুর্ত। আশাশুনি, কালিগঞ্জ এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের সিটিসি কমিটির চেয়ারম্যান, মেম্বার, সচিব—এছাড়া সিটিএন ও সিটি আইপি সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী এবং মানব পাচারের স্বীকার ভুক্তভোগীরা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, বিদেশে নেওয়ার নামে প্রতারণা, সীমান্তে আটকে পড়া, অমানবিক নির্যাতন—এসব ভয়াবহতার বাইরে আসতে সামাজিক পুনর্বাসন খুব গুরুত্বপূর্ণ।-
সম্মেলনে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়। দিনব্যাপী আলোচনার পর নিম্নোক্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়—• ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার শনাক্ত করে ইউনিয়ন পর্যায়ে তালিকা প্রস্তুত। স্কুল–কলেজে নিয়মিত সচেতনতা ক্লাস। দালালচক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান।
বিদেশগমনের ক্ষেত্রে বৈধ প্রক্রিয়া প্রচার।সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি। ভুক্তভোগীদের কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন জোরদার। গণমাধ্যমের সঙ্গে তথ্য-সমন্বয় বাড়ানো। ইউনিয়ন টাস্কফোর্সকে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা। সম্মেলনের শেষে রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ মানব পাচারমুক্ত সাতক্ষীরা গড়তে সকল পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।







