জি এম আমিনুল হক : প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মই যেন আজন্ম পাপ শারীরিক প্রতিবন্ধী আবুবকর সিদ্দিকের। এখন তার বয়স পঁচিশ বছর। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার অপরাধে তার মা হাসিনা খাতুনকে তালাক দিয়েছিল পিতা আব্দুল বিশ্বাস।

এরপর থেকে হাসিনা খাতুন সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে ২৩ বছর ধরে একা হাতে মাঠে ও ক্ষেত খামারে বৃদ্ধা মা আর প্রতিবন্ধী ছেলেকে আগলে রেখেছিল। কিন্তু ক্যানসারের কাছে হার মেনে বিনা চিকিৎসায় তিনিও চলে গেছেন ২ বছর আগে।

এখন ভাঙা টালির ছোট্ট ঝুপড়িতে বৃদ্ধা নানি আর শারীরিক প্রতিবন্ধী নাতির ঠিকানা। কথা বলা কিংবা হাঁটাচলা নিজের ইচ্ছায় কিছু করতে পারে না। দুবেলা পেট ভরে খাবার জোটে না, চিকিৎসা তো দূরের কথা। অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে প্রতিবন্ধী আবুবকর সিদ্দিক ও তার নানি সত্তরোর্ধ বৃদ্ধা নানি সোনাভান বিবি।

‎বলছিলাম সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের বেড়বাড়ী গ্রামের জন্মগতভাবে শারিরীক প্রতিবন্ধী আবুবকর সিদ্দিকের কথা। বয়স ২৫ বছর। প্রতিবন্ধী ছেলের দায়িত্ব নিতে চাননি বাবা। তাই আবুবকরের মা’কে তালাক দিয়ে তিনি অন্যত্র চলে যান।

‎স্বামীর সংসার ভেঙে যাওয়ার পর আবুবকরকে কোলে নিয়ে বৃদ্ধা মা সোনাভান বিবির কাছে আশ্রয় নেন মা। তারপর শুরু হয় বেঁচে থাকার যুদ্ধ। ২৩ বছর ধরে অন্যের জমিতে মাঠে কাজ করেছেন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের বাড়িতে, ক্ষেতে-খামারে কাজ করে যে কয়টা টাকা আয় হতো তা দিয়েই বৃদ্ধা মা আর প্রতিবন্ধী ছেলের মুখে খাবার তুলে দিতেন।

‎কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। দুই বছর আগে হঠাৎ করে মা ক্যানসারে আক্রান্ত হন। টাকার অভাবে একটা ভালো ডাক্তারও দেখানো যায়নি। বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যান তিনি। মা মারা যাওয়ার পর আবুবকর সিদ্দিক আর তার বৃদ্ধা নানির জীবনে নেমে আসে অমাবস্যার কালো অন্ধকার।

‎বর্তমানে ৭০ বছরের বেশি বয়সী নানি সোনাভান বিবি নিজেই চলতে পারেন না ঠিকমতো। তার ওপর সংসারের পুরো দায়িত্ব ও শারীরিক ও বাক প্রতিবন্ধী আবুবকর সিদ্দিকে দ্বায়িত্বও তার কাঁধে। কিন্তু তিনি তো নিজেই তো অসহায়।

‎তাদের বসবাসের ঘরটিও জরাজীর্ণ। টালি ভাঙা, বৃষ্টি এলে চারিদিক দিয়ে পানি পড়ে। ঘরে আসবাব বলতে কিছুই নেই। রান্নার জন্য হাঁড়ি-পাতিলও ভাঙাচোরা। প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে একবেলা খাবার দিলে সেটাই খেয়ে দিন পার করেন তারা। বেশিরভাগ দিনই যায় অনাহারে বা অর্ধাহারে।

‎স্থানীয়রা জানান, হাড্ডিসার শূন্য আবুবকর সিদ্দিক কথা বলতে না পারলেও কেউ তার পাশে গেলে অসাধারণ এক জাদুকরী মায়াবী হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। খুবই শান্ত স্বভাবের ছেলে। কখনো কারো কাছে হাত পাতে না। লজ্জায় চুপচাপ বসে থাকে। কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা আর সহ্য করতে পারছে না। বৃদ্ধা নানি আরও বলেন, “আমার মেয়িডা মরি যাবার পর থেকি আমরা মাঝে মদ্দি না খেয়ি থাকি। ছ্যামড়াডা প্রতিবন্ধী।সে নিজি থেকি কিছু করতি পারে না। তার সব কাজ আমাকে করতে হয়।

‎স্থানীয় ইউপি সদস্য আনিসুর রহমান আনিস জানান -শারীরিক প্রতিবন্ধী আবুবকরকে প্রতিবন্ধী ভাতা ও বৃদ্ধা সোনাভান বিবিকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তবে এই সামান্য টাকায় পরিবারটি চলতে পারে না।

‎স্থানীয়রা জানান – মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত দারিদ্র সীমার সব সুচকের নিচে থাকা প্রতিবন্ধী আবুবকর সিদ্দিক ও তার বৃদ্ধা নানি সোনাভান বিবিকে অবিলম্বে মানবিক সাহায্য দরকার।

ক্যানসারে আক্রান্ত মা হাসিনা খাতুন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে যুদ্ধ করে গেছেন তার প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য। তিনি মারা যাওয়ায় আজ সেই সন্তান আর বৃদ্ধা মা বিনা চিকিৎসা আর অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের কাছে তাদের একটাই করুন আর্তি “আমাদের একটু বাঁচার মতো বাঁচতে দেন, আমরা বাঁচতে চাই”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *