নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার চণ্ডীপুর মৌজায় দীর্ঘ চার দশকের জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে হাইকোর্টের স্ট্যাটাসকো আদেশকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে মাছের ঘেরে হামলা, নেট ও পাটা খুলে তছনছ এবং লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুনরায় হামলা ও প্রাণনাশের আশঙ্কায় আগেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন ভুক্তভোগী দুলালী তরফদার। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে তদন্ত করে পুলিশ অভিযোগকারীদের ভৎসনা করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, বিরোধপূর্ণ জমিটি শ্যামনগর উপজেলার চণ্ডীপুর মৌজার এস খতিয়ান নং-১০৮, এস দাগ নং-১৭৭ এবং আরএস খতিয়ান নং-৪৩১, আরএস দাগ নং-৩৬৫-এর অন্তর্ভুক্ত। জমির পরিমাণ এস জরিপে ১ দশমিক ৫৩ একর হলেও বর্তমান জরিপে তা ১ দশমিক ৪৫ একর হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, তারা গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই জমিতে মাছের ঘের করে শান্তিপূর্ণভাবে দখলে রয়েছেন এবং অদ্য ১৮ জুলাই ২০২৬ তারিখেও তাদের দখল বহাল রয়েছে।
জানা যায়, ১৯৭৯ সালে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার আগে দীনদয়াল তরফদার তার ১ দশমিক ৫৩ একর জমি মীরা তরফদারের কাছে রেজিস্ট্রিকৃত একরারনামার মাধ্যমে বন্ধক রেখে যান। পরে ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এর আগেই তার একমাত্র ছেলে মারা যাওয়ায় পুত্রবধূ দুলালী তরফদার ও ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন তরফদার উত্তরাধিকারী হন।

পরে বন্ধকী জমি নিয়ে আদালতে মামলা হলে ১৯৮৪ সালে আদালত একরারনামাকে বৈধ বন্ধক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে টাকা আমানত মামলা খারিজ করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে উত্তরাধিকারী বীরেন তরফদারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলের মাধ্যমে দুলালী তরফদার জমির মালিকানা অর্জন করেন।

অভিযোগে বলা হয়, জমির দখল বুঝে না পাওয়ায় দুলালী তরফদার শ্যামনগরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৯৯৭ সালে তার পক্ষে রায় হয় এবং সরকারি প্রক্রিয়ায় ঢোল-সহরতের মাধ্যমে তাকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে জমি ভোগদখল করে আসছেন।
বাদীপক্ষের দাবি, এ রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ মীরা তরফদার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), বিভাগীয় কমিশনার, ভূমি আপিল ট্রাইব্যুনালসহ নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মামলা ও আপিল করলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাদীপক্ষের অনুকূলে রায় হয়েছে। একই সঙ্গে জমির নামজারি সম্পন্ন হয়েছে, নিয়মিত সরকারি খাজনা পরিশোধ করা হচ্ছে এবং সর্বশেষ বিএস খতিয়ানও দুলালী তরফদারের নামে মুদ্রণ ও সরবরাহ করা হয়েছে।

তবে বিএস খতিয়ান প্রকাশের আগে মীরা তরফদার হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন, যেখানে স্ট্যাটাসকো আদেশ দেওয়া হয়। বাদীপক্ষের দাবি, পরবর্তীতে বিএস খতিয়ান প্রকাশ ও সরবরাহ হয়ে যাওয়ায় রিটটি কার্যত অকার্যকর (ইনফ্রাকচুয়াস) হয়ে পড়লেও মামলার শুনানি বারবার পেছানোয় বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

ভুক্তভোগী দুলালী তরফদার অভিযোগ করেন, স্ট্যাটাসকো আদেশের সর্বশেষ মেয়াদ বৃদ্ধিকে নিজেদের পক্ষে রায় হিসেবে প্রচার করে প্রতিপক্ষের লোকজন দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছিল। এ আশঙ্কায় তিনি গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ শ্যামনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন, যার নম্বর ১৮৭৪।

অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও গত ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে মনরঞ্জন তরফদারের ছেলে শংকর তরফদার ও তার সহযোগীরা মাছের ঘেরে প্রবেশ করে নেট, পাটা ও অন্যান্য স্থাপনা খুলে ও কেটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। পরদিন ১৬ জুলাই শংকর তরফদার শ্যামনগর থানায় অভিযোগ দিয়ে দাবি করেন, ঘেরের দখল তাকে দেওয়া হচ্ছে না।

এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১৭ জুলাই সকালে শ্যামনগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে সরেজমিন তদন্ত করে। বাদীপক্ষের দাবি, তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগকারী শংকর তরফদার ও তার সহযোগীদের ভৎসনা করেন এবং যাদের দখলে ঘের রয়েছে তাদের কাজে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করার নির্দেশ দিয়ে আসেন।

এ বিষয়ে শংকর তরফদার, দুলালী তরফদারের ঘেরের নেট-পাটা ভাংচুর ও দখল চেস্টার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। তারা দ্রুত হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার নিষ্পত্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন করে সংঘাত এড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *