বিশেষ প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার চাম্পাফুল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাম্পাফুল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ। দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি বিদ্যালয় হিসেবে নয়, বরং চাম্পাফুল ও আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আগামীকাল ১৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট অভিভাবক, শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। নির্বাচনে মোট ৭০৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সভাপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় এবারের নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমে উঠেছে। দুটি পৃথক প্যানেলে ভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
সভাপতি পদে একদিকে রয়েছেন নির্দলীয় প্রার্থী গোলাম মোস্তফা, যিনি কৃষি ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার। অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন জামায়াত-সমর্থিত আরিফ বিল্লাহ। ফলে সভাপতি পদকে কেন্দ্র করে দুটি পক্ষের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সমর্থন বা প্যানেলভিত্তিক পরিচয়ের বাইরে এ নির্বাচন মূলত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামো নির্ধারণের নির্বাচন। ফলে শেষ পর্যন্ত অভিভাবক ভোটাররা বিদ্যালয়ের শিক্ষা, শৃঙ্খলা, অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভোট দেন—সেদিকেই থাকবে সবার দৃষ্টি।
শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : চাম্পাফুল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের দীর্ঘ স্মৃতি। ২০২৩ সালে বিদ্যালয়টি ৯৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছিল। সেই হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির সূচনা ১৯২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সময়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পরিচালনা কমিটির সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়েছিল।
বিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি শুধু রসায়ন বিজ্ঞানের একজন পথিকৃৎ ছিলেন না, শিক্ষা বিস্তার, শিল্পোন্নয়ন, স্বদেশি উদ্যোগ এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে সাতক্ষীরার চাম্পাফুলের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাঁর অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জীবনদর্শনের অন্যতম দিক ছিল শিক্ষার প্রসার এবং মানুষের আত্মনির্ভরতা। তাঁর নাম ধারণকারী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে চাম্পাফুলের এই বিদ্যালয়ের ইতিহাস তাই স্থানীয় পরিসর ছাড়িয়ে বৃহত্তর শিক্ষা-ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
দীর্ঘ সময় ধরে এই বিদ্যালয় থেকে বহু শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। শিক্ষক, ডাক্তার,সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংকার, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ নানা পেশায় ছড়িয়ে থাকা সাবেক শিক্ষার্থীদের স্মৃতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নাম জড়িয়ে আছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেক অভিভাবকেরও এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে রয়েছে পারিবারিক সম্পর্ক—কেউ নিজে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, আবার এখন তাঁর সন্তান একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে।
শুধু নির্বাচন নয়, প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রত্যাশা : একটি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি কেবল প্রশাসনিক একটি কাঠামো নয়। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় কমিটির ভূমিকা রয়েছে।
তাই আগামীকালের নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের প্রত্যাশাও কম নয়। একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের সামনে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, পাঠাগারের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ—সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ।
একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কৃতীজন এবং বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মৃতি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, পুরোনো নথি সংরক্ষণ এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি সক্রিয় অ্যালামনাই কাঠামো গড়ে তোলাও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে।
নির্বাচনের মাঠে দুটি প্যানেল : আগামীকালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দুটি প্যানেল মাঠে রয়েছে। সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর সমর্থকেরা নিজেদের পক্ষে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নির্বাচনী প্রচারে স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত পরিচয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে নানা প্রত্যাশার কথা উঠে আসছে।







