শেখ সিদ্দিকুর রহমান : সাতক্ষীরার সুলতানপুর বাজারের এক কোণে ছোট্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দোকানের সামনে ঝুলছে সাদামাটা একটি সাইনবোর্ড, কিন্তু সেই সরল নামফলকের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক বহুমাত্রিক মানুষের গল্প।

সকালবেলা দোকানের শাটার তুলেই তিনি যেমন হাসিমুখে ক্রেতাকে স্বাগত জানান, বিকেল গড়ালেই ছুটে যান মহড়ার মঞ্চে কখনও নাটকে, কখনও ভিডিও সিরিজে। এই মানুষটির নাম শেখ মনিরুল ইসলাম— ব্যবসায়ী, অভিনেতা, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং সাংগঠনিক দক্ষতায় অনন্য এক সাংস্কৃতিক মানুষ।

কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীকলা গ্রামের জোবেদ আলির কনিষ্ঠ পুত্র মনিরুল আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে সাতক্ষীরা শহরে এসেছিলেন জীবিকার সন্ধানে। শুরুটা ক্ষুদ্র ব্যবসা দিয়ে, কিন্তু তার ভেতরে জেগেছিল এক গভীর সাংস্কৃতিক তাড়না শিল্পের, নাটকের, সৃজনের প্রতি এক অদম্য ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই তাকে টেনে নিয়েছিল স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের নাট্যদলে।

শুরু করেন যাত্রা ও মঞ্চনাটকে অভিনয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন অভিনয় জগতের এক পরিচিত মুখ। বন্ধন টেলিমিডিয়ার হয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি ইউটিউবের অসংখ্য নাটক ও শর্টফিল্মে খল চরিত্র, কৌতুক চরিত্র এবং বলিষ্ঠ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন।

তার সংলাপের গভীরতা, দেহভঙ্গির সাবলীলতা এবং সময়জ্ঞান দর্শকদের মুগ্ধ করে। এক দশক আগে তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সাতক্ষীরা জেলা সংসদে নাট্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের যাত্রা।

উদীচীর সভাপতি ও সাহিত্য সম্পাদক শেখ সিদ্দিকুর রহমানের সান্নিধ্যে এসে তিনি সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। প্রথমে স্থানীয় দৈনিক সাতক্ষীরার সকাল পত্রিকায়, এরপর যোগ দেন জাতীয় পত্রিকায়। সংবাদ লেখার কৌশল, অনুষ্ঠান পরিচালনা, বক্তব্য প্রদান সবই তিনি শেখেন নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে। আজ তিনি শুধুই নাট্যকর্মী নন, বরং সাতক্ষীরার নির্ভরযোগ্য, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকদের অন্যতম।

ঢাকার সম্পাদকমহলেও তার নাম উচ্চারিত হয় সম্মানের সঙ্গে। তার সততা, সময়নিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা তাকে এনে দিয়েছে বিশেষ আস্থা। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি ও খুলনা ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে শেখ মনিরুল ইসলামের জীবন কেবল আলোয় নয় রয়েছে গভীর ছায়ারও গল্প। তিনি বিপত্নীক, প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর পরও তিনি ভেঙে পড়েননি।

দায়িত্বের দৃঢ়তায়, সন্তানদের প্রতি ভালোবাসায় তিনি নিজেকে ধরে রেখেছেন এক অবিচল মানুষ হিসেবে। তার দুটি সন্তান এক ছেলে আলি হাসান ও এক মেয়ে সোহাগী পারভীন মুন্নি। দুজনই বিবাহিত, স্ব-স্ব পরিবারে সুখে আছেন। সন্তানদের জন্য তার মমতা এক পিতৃসম মহীরুহের মতো, যার ছায়ায় সংসার ও সমাজ উভয়ই শান্ত। অভিনয় ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি মানবিক কাজে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন।

বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক কর্মী ঐক্য পরিষদের জেলা সভাপতি, বিশ্ব গণমানুষের সেবা ফাউন্ডেশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার প্রচার সম্পাদক এবং বন্ধন টেলিমিডিয়ার সহ-সভাপতি হিসেবে তিনি সমাজের নানা ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে, কারও বিপদে বা দুর্ঘটনার মুহূর্তে তিনি ছুটে যান মানুষের পাশে যেন এক স্বেচ্ছাসেবী ফায়ার ফাইটার।

তার আশেপাশের মানুষরা বলেন, “মনিরুল ভাই এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের কষ্ট লুকিয়ে অন্যের হাসি ফিরিয়ে আনেন।” ক্ষুদ্র ব্যবসা দিয়ে শুরু করা এই মানুষটি কখনও টাকার পেছনে ছোটেননি। জীবনের সঞ্চয় তিনি খুঁজে পেয়েছেন মানুষের ভালোবাসায়, সংস্কৃতির চর্চায়, সমাজসেবায়। তার সদাহাস্য মুখ, বিনয়ী আচরণ ও আন্তরিকতার জন্য তিনি জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, চিকিৎসা প্রশাসন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের সবার কাছেই প্রিয় এক নাম।

অভিনয়ের মাধ্যমে শিল্পের যে সেতুবন্ধন তিনি গড়েছেন, সাংবাদিকতার মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন মানুষের জীবনে— সত্য, সৌন্দর্য ও মানবতার বার্তা হিসেবে। একদিকে তিনি সংস্কৃতির মঞ্চে আলোকিত অভিনেতা, অন্যদিকে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক সহৃদয় মানুষ। শেখ মনিরুল ইসলাম আজ সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক ও মানবিক পরিমণ্ডলে এক আলোকিত উদাহরণ— যে আলো ছুঁয়ে যায় মানুষের হৃদয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *