​নিজস্ব প্রতিনিধি : ​প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ঋতু বদলায়, বদলায় দৃশ্যপট। কিন্তু কিছু বিদায় শুধু নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক পশলা বিষণ্ণতার নাম। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর (ডি. বি) মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের আঙিনায় বৃহস্পতিবার তেমনই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘ ২৭ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে অবসরে গেলেন বিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক অনুজিত কুমার মন্ডল।

​ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রবীণ শিক্ষকের বিদায় সংবর্ধনা, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীদের নবীন বরণ অনুষ্ঠান।

​বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এক ফাল্গুনি সকালে এই বিদ্যাপীঠে শিক্ষক হিসেবে পদার্পণ করেছিলেন অনুজিত কুমার মন্ডল। ২৭ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, বরং বিদ্যালয়ের অভিভাবক ও ‘বটবৃক্ষ’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সহকর্মীরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, কনিষ্ঠ চারাগাছটি আজ যেমন ফলে-ফুলে সুশোভিত মহীরুহ, অনুজিত বাবুও ঠিক তেমনি সাতাশ বছর ধরে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন।

​বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এমাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবুল হোসেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “অনুজিত কুমারের মতো নিষ্ঠাবান শিক্ষক একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ। তার অভাব পূরণ হওয়ার নয়।”

​সংবর্ধিত শিক্ষক অনুজিত কুমার মন্ডল তার আবেগঘন বক্তব্যে দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “শিক্ষকতা আমার কাছে পেশা নয়, বরং একটি পবিত্র ব্রত ছিল। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।”

​অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক এস. এম শহীদুল ইসলামের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন মো. নজিবুল ইসলাম, হাফিজুল ইসলাম, দেবব্রত ঘোষ, অরুণ কুমার মন্ডল, ভানুবতী সরকার, আসমাতারা জাহান, কনক কুমার ঘোষসহ অন্যান্য সহকর্মীবৃন্দ। ছাত্রীদের পক্ষ থেকে পাঠ করা হয় মানপত্র, যেখানে তাকে ‘কালজয়ী সারথি’ ও ‘আলোর দিশারি’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়।

​বিদ্যালয়ের বিদায়ী শিক্ষার্থীরা অশ্রুসজল চোখে বলেন, ​“স্যার আমাদের শুধু পাঠ্যবই পড়াননি, শিখিয়েছেন জীবনের মানে। তিনি প্রদীপের মতো নিজেকে ক্ষয় করে আমাদের জীবনকে আলোকিত করেছেন।”

​একদিকে নবীন ছাত্রীদের বরণ করে নেওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে প্রিয় শিক্ষক ও বড় বোনদের বিদায় জানানোর বেদনা—সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিদ্যালয় চত্বরে। অনুষ্ঠান শেষে প্রিয় শিক্ষককে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।

​সবশেষে এক বিশেষ প্রার্থনায় তার অবসর জীবনের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটলেও অনুজিত কুমার মন্ডলের আদর্শ ও স্মৃতি এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণায় অমলিন থাকবে।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *