একরামুজ্জামান (জনি) : ২০০৬ সালে দেশে সমান মজুরি আইন পাস হলেও দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরেও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়নি। একই সময় ও সমপরিমাণ কাজ করেও পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন নারী শ্রমিকরা।
ফলে ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হয়ে জীবিকা নির্বাহে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের। সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কাঁকড়ার খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা, রাজমিস্ত্রির সহকারী, মাটিকাটা, গ্রামীণ রাস্তানির্মাণ ও সংস্কার, কৃষিকাজ করেন। তবে এসব নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে সফটশেল কাঁকড়া চাষ। এই খাতকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, যেখানে শ্রমিকদের একটি বড় অংশই নারী।
কাঁকড়া খামারে খাবার প্রদান, কাটিং, শেল সংগ্রহ, বাছাই ও পরিষ্কারসহ নানা কাজে পুরুষদের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করছেন নারীরা। প্রতিদিন নির্ধারিত সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করলেও মজুরির ক্ষেত্রে রয়ে গেছে স্পষ্ট বৈষম্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একই কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিক যেখানে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান, সেখানে নারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকার নারী শ্রমিক রিনা খাতুন বলেন,আমি একটি কাঁকড়ার খামারে কাজ করি। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। মাসিক বেতন সাড়ে ৭ হাজার টাকা। আমার সঙ্গে একই কাজ করে একজন পুরুষ সহকর্মী বেতন পান ৯ হাজার টাকা। খামারের অনেক কঠিন কাজ আমি করি। বাকিরা আমার চেয়ে সহজ কাজ করে কিন্তু পুরুষ হওয়ায় তাদের বেতন বেশি। বার বার বেতন বাড়াতে বললেও কাজ হয় না।
শ্রমিক মুজি বেগম জানান, আমি ধান কাটার কাজ করি। কাজে কোনো কমতি রাখি না, তারপরও আমাদের মূল্যায়ন কম। সমান মজুরি পেলে জীবনটা একটু স্বস্তির হতো। এক বেলা কাজ করলে ৫০০ টাকা সেখানে পুরুষ পায় ৮০০ টাকা। তাদের থেকে আমরা কাজ কোনো তো কম নেই পুরুষ ও যে কাজ করে আমরা ও সেই একই কাজ করি।
স্বামী-স্ত্রী একসাথে কাজ করা শ্রমিক কামরুল মল্লিক বলেন, আমি আর আমার স্ত্রী প্রতিদিন একসাথে রাস্তার ইটের কাজ করি । সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একই কাজ করি, পরিশ্রমও সমান। কিন্তু মজুরির সময় দেখি আমার স্ত্রী আমার চেয়ে কম টাকা পায়। এটা একেবারেই অন্যায়। আমরা চাই, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ না করে সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা হোক।
শুধু কাঁকড়া শিল্পেই নয়, মাটি কাটা, কৃষিকাজ ও ইটের ভাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নারীরা সমান কাজ করেও কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলার সিসিটিবি’র উপজেলা কো-অর্ডিনেটর স্টিভ রায় রুপন বলেন, নারীরা শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু সচেতনতা নয়, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা একটি মৌলিক অধিকার। স্থানীয় প্রশাসন, মালিকপক্ষ ও সচেতন মহলের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।
এদিকে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিস্ আফরোজা আক্তার বলেন, শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে কাঁকড়া শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈষম্য দ্রুত দূর করা না গেলে সম্ভাবনাময় এই খাত তার পূর্ণতা পাবে না।







