oplus_0

বিশেষ প্রতিনিধি : ‘ওরে আজ কি গান গেয়েছে পাখি, এসেছে রবির কর’—কবির সেই চিরন্তন আহ্বানে যেন সাড়া দিল সাতক্ষীরার প্রকৃতি। জ্যৈষ্ঠের খরতাপের আগে বৈশাখের এই শেষ প্রহরে, রবির কিরণ যখন নাজমুল সরণির ম্যানগ্রোভ সভাঘরে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে, তখনই সেখানে বসেছিল সুর ও বাণীর এক মায়াবী মেলা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মতিথি উপলক্ষে লিনেট ফাইন আর্টস একাডেমি ও আজমল স্মৃতি সংসদ আয়োজন করেছিল এক বর্ণাঢ্য রবীন্দ্র জয়ন্তীর।

​শুক্রবার (১৫ মে) সকালের স্নিগ্ধ আলোয় নান্দনিক এই অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। আয়োজনের মূল সুরটি ছিল কবিগুরুর প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া। লিনেট ফাইন আর্টস একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও বরেণ্য সংগীতশিল্পী আবু আফফান রোজবাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করেন একঝাঁক সংস্কৃতিজন।

​অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে রবীন্দ্র-দর্শনের ওপর আলোকপাত করেন সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ ইফতেখার আলী, সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল হামিদ, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জি, কবি পল্টু বাশার এবং জেলা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি শহিদুর রহমান।

অনুষ্ঠানে অ্যাডভোকেট সৈয়দ ইফতেখার আলী বলেন, আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। গান, কবিতা, আবৃত্তির মঞ্চ, বাউল, কীর্তন, জারি, সারি, ভাটিয়ালি এমনকি পুঁথিপাঠও হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শৈশবে বটছায়া বসতো এসব গান, কবিতা ও সংস্কৃতি চর্চার আসর। এটা হারিয়ে যেতে দিলে হবে না। আমাদের এগুলো রক্ষা করতে হবে। আমাদেরকে আন্দোলিত হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এগুলো একদিকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি একটি মৌলবাদী শক্তি তারা জাগ্রত হচ্ছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা রাজনীতি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাদেরকে রুখে দিতে হবে। আর তাদের রুখতে হলে সাংস্কৃতিক অবয়বকে সমৃদ্ধ করতে হবে। যাত্রাশিল্প মানুষের আবেগকে জাগ্রত করে। এটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর মানুষের আবেগ ও অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই আমরা সমৃদ্ধ হবো। তিনি বাংলা সাহিত্যের সকল কবি, সাহিত্যিকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয় আবৃত্তি করেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা ‘প্রিয়তমাষু’ কবিতাটি। এসময় পিনপতন নীরবতা নেমে আসে।

বক্তারা বলেন, রবির করের মতোই উজ্জ্বল হয়ে উঠুক আমাদের মানবিকতা।যখন আমার দুঃখ কষ্টে শিখরে অশ্রুপাত তখন যিনি দুঃখ ভুলান তিনিই রবীন্দ্রনাথ।
যখন আমি হারিয়ে যাই কেউ ধরেনা হাত তখন যিনি পৌছে দেন তিনিই রবীন্দ্রনাথ।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগীতশিল্পী চৈতালী মুখার্জি, মনজুরুল হক, উদীচীর জেলা সভাপতি শেখ সিদ্দিকুর রহমান, মন্ময় মনির, মিতুল, মনিরুজ্জামান ছট্টু, স ম তুহিন, সুলতান মাহমুদ রতন, ছড়াকার আহমেদ সাব্বির, কথাশিল্পী বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী, এসএম শহীদুল ইসলাম, প্রতাপ সিং, আশুতোষ সরকার, নিলয়, তারক মন্ডল প্রমুখ।

আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে চলে লিনেট ফাইন আর্টস একাডেমির শিক্ষার্থী ও বন্ধুদের মনকাড়া সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী দিলরুবা রুবি ও সংস্কৃতিকর্মী মৃত্যুঞ্জয় কুমার বিশ্বাসের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় মঞ্চটি যেন হয়ে উঠেছিল এক টুকরো শান্তিনিকেতন।

​রওনক ও অস্বিতার দ্বৈত কণ্ঠে ‘আমাদের ছোট নদী’র কলতানে যেন স্মৃতির নদী বয়ে গেল সভাঘরে। নিষ্কৃতি ও নৈঋত একবার দ্বৈত সংগীতে শ্রোতাদের বিমোহিত করলেন, আবার ‘ছুটি’ কবিতার দ্বৈত আবৃত্তিতে শৈশবকে ফিরিয়ে আনলেন মঞ্চে। খুদে শিল্পী রিধিমা যখন ‘দামোদর শেঠ’ আবৃত্তি করছিল, তখন উপস্থিত সবার মুখে ফুটে ওঠে অমলিন হাসি।

​সহজ পাঠের কবিতার বৃন্দ আবৃত্তি আর নন্দিনী ও অধরার দ্বৈত কণ্ঠে ‘ক্ষান্ত বুড়ী’র গল্পে মুগ্ধতা ছড়ায়। বীরত্বের সাজে ‘বর এসেছে বীরের ছাঁদে’ এবং নিধির কণ্ঠে ‘মাস্টার বাবু’র অনুযোগগুলো ছিল উপভোগ্য। প্রিয়ন্তী ও মাইশার ‘এক গাঁয়ে’ এবং পিউলীর কণ্ঠে ‘হারিয়ে যাওয়া’র বিষাদমাখা পঙ্‌ক্তিগুলো দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গানের সুরে আকাশ-বাতাস মুখরিত করেন প্রিয়ন্তী স্নেহা, সমৃদ্ধ ও নিলয়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘সোনার তরী’র বৃন্দ আবৃত্তি, যা দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় মহাকালের সেই অমোঘ সত্যকে।

​অনুষ্ঠানে মিশাল, বন্ধন, নিষ্কৃতি, নৈঋত, নিধি, প্রাপ্তি, প্রিয়ন্তী স্নেহা, সমৃদ্ধ, প্রজ্ঞা, নিলয় ও স্বয়ং আবু আফফান রোজবাবুর সমবেত সংগীতের মূর্ছনায় অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। বৈশাখের বিদায়বেলা আর রবীন্দ্র-স্মরণের এই মেলবন্ধন সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *