শেখ সিদ্দিকুর রহমান : জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা, উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত সংকট নিরসন এবং আসন্ন জাতীয় বাজেটে উপকূলবাসীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবিতে সাতক্ষীরায় সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৩ মে শনিবার বেলা এগারোটায় সাতক্ষীরা শহরের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে “ক্লাইমেট এ্যাকশন ফোরাম (CAF)” এর আয়োজনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল হামিদ। দেশ টিভির সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি শরিফুল্লাহ কায়সার সুমনের সঞ্চালনায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উন্নয়ন সংগঠন “স্বদেশ” এর নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি মনিরুল ইসলাম মিনি, এটিএন বাংলার জেলা প্রতিনিধি এম কামরুজ্জামান, উদীচী সাতক্ষীরার সভাপতি, লেখক ও গবেষক শেখ সিদ্দিকুর রহমান, সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না, দৈনিক পত্রদূতের বার্তা সম্পাদক এস এম শহিদুল ইসলাম, জেলা ভুমিহীন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদসহ অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ার বহু সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
লিখিত বক্তব্যে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তত ১৭টি জেলা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশালসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সুপেয় পানির সংকট, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং পরিবেশগত বিপর্যয় দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। অথচ জাতীয় বাজেটে উপকূলীয় মানুষের বাস্তব সমস্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকা রক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি ১৭ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে অবিলম্বে একটি “উপকূল উন্নয়ন বোর্ড” গঠন করতে হবে। সেখানে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের জন্য পৃথক দপ্তর গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে অঞ্চলভিত্তিক সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা যায়।
বক্তারা আরও বলেন, উপকূলের দীর্ঘ তটরেখা ঘিরে পরিবেশবান্ধব “ইকোনমিক জোন” গড়ে তুলতে হবে এবং ব্লু-কার্বন সংরক্ষণ জোরদার করে কার্বন-ক্রেডিট বিপণনের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধ্বংসকারী কোনো প্রকল্প যেন উপকূলে গ্রহণ করা না হয় সে বিষয়েও কঠোর অবস্থানের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে উপকূল রক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং জাতীয় বাজেটে আলাদা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের দাবিও জানানো হয়। বিশেষ করে নগদ সহায়তা, খাদ্য সহায়তা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও জোরদার করার কথা উল্লেখ করা হয়। বক্তারা বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি, দারিদ্র্য ও বিপদাপন্নতার মাত্রা বিবেচনায় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ উপকূলসংলগ্ন উপজেলাগুলোতে বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে উপকূলীয় এলাকায় ক্লাস্টারভিত্তিক বসতি পরিকল্পনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদী ব্যবস্থাপনায় “টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (TRM)” পদ্ধতি কার্যকর করার দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় অনেক নদী ও খাল ভরাট হয়ে গেছে। ফলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসব নদী ও খাল অবিলম্বে ড্রেজিং করে সচল করতে হবে।
এছাড়া “একটি বাড়ি, একটি খামার” প্রকল্পের আদলে “একটি বাড়ি, একটি শেল্টার” কর্মসূচি গ্রহণের দাবি জানানো হয়, যাতে উপকূলের প্রতিটি পরিবার দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় পায়। উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের তথ্যভান্ডার তৈরি এবং টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা বলেন, বর্তমান ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোই জরাজীর্ণ ও অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত সংস্কার এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাঁধ ব্যবস্থাপনা পরিচালনার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বৃহৎ জলাধার নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ
পানির ব্যবহার কমানো এবং পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলীয় বন ও সবুজ বেষ্টনী সৃষ্টির বিষয়েও জোর দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় রোধে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং সুন্দরবনসহ উপকূলীয় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান উন্নয়ন জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকা রোগব্যাধি মোকাবিলায় বিশেষ স্বাস্থ্য পরিকল্পনা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়।
একইসঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ায় এমন কার্যক্রম, বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত লবণাক্ততা সৃষ্টিকারী চিংড়ি চাষ সীমিত ও পরিকল্পিত করার কথা বলা হয়। সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য জীবনবীমা, সামাজিক নিরাপত্তা, আধুনিক নৌ-ট্রাফিক ব্যবস্থা (VTS), আবহাওয়া তথ্য ও রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, উপকূল রক্ষা শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্ন। তাই সরকারের সব মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলে মানবিক ও পরিবেশগত সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।







