আলতাফ হোসেন বাবু : সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে রাজনীতি, উন্নয়ন ও জনমানুষের স্বপ্নের সঙ্গে যেসব নাম দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত হয়ে আসছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কাজী আলাউদ্দীন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ করে কালিগঞ্জ ও দেবহাটা অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে স্থানীয় জনগণের কাছে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেছেন।
১৯৫৩ সালের ১০ জানুয়ারি সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা মরহুম কাজী নুরুল হুদা এবং মাতা মরহুমা রিয়াতুন্নেছা। শৈশব থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্ভোগ এবং রাজনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁকে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে অনুপ্রাণিত করে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তৃণমূল মানুষের আস্থা অর্জন করেন। বিশেষ করে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কালিগঞ্জ ও দেবহাটা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। স্থানীয় মানুষের ভাষ্যমতে, ওই সময় এলাকায় যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল, তা এখনও অনেকেই স্মরণ করেন।
সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীন বলেন, তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে দুর্গম অঞ্চলের মানুষকে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়, যাতে গ্রামের শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উন্নয়নেও তিনি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন।
মসজিদ, মন্দির সংস্কার ও নির্মাণে সহযোগিতা করে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, “সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আমার কাছে সবসময় নিরাপদ ও সুরক্ষিত ছিল। আমি কখনও ধর্মভেদে রাজনীতি করিনি। মানুষের কল্যাণই ছিল আমার রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য।” তিনি আরও বলেন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, “কোন দুর্নীতিবাজের স্থান আমার কাছে ছিল না।” স্থানীয় জনগণের অনেকেই মনে করেন, তাঁর সময়ে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কাজী আলাউদ্দীন বলেন, ক্রয়োদশ সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের পর সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন লাভ করেন। কেন্দ্রীয় কমিটি তাঁকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বিজয়ী হতে পারেননি। এই পরাজয়ের বিষয়ে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করলেও জনগণের প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই বলে জানান।
তাঁর ভাষায়, “মানুষ হয়তো আমার মনের কথা বুঝতে পারেনি। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং কথিত একটি ইসলামী দলকে ভোট দিয়েছে। তবে আমি জনগণকে দোষ দিই না। তারা যদি বুঝতে পারত যে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাময় দল, তাহলে সেই দলের প্রার্থী হিসেবে আমাকে নির্বাচিত করলে এলাকার উন্নয়নে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব হতো।”
তিনি বলেন, নির্বাচিত হতে পারলে তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কয়েকটি বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন। এর মধ্যে ছিল ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু করা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। পাশাপাশি বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাও তাঁর অন্যতম অঙ্গীকার ছিল।
উপকূলীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে তিনি টেকসই বেড়িবাঁধ সমস্যাকে চিহ্নিত করেন। আশাশুনি ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে হাজার হাজার কৃষক ও মৎস্যচাষির জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়। ফসলি জমি নষ্ট হয়, মাছের ঘের ও ভেড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষ আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
কাজী আলাউদ্দীন বলেন, “এই অঞ্চলের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। তাই উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই।” তিনি আশাশুনির সকল ভেড়িবাঁধ আধুনিক ও টেকসইভাবে নির্মাণ করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি অবৈধ খাল দখলমুক্ত করা, পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান।
তাঁর মতে, জলাবদ্ধতা ও নিরাপদ পানির অভাব বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য অন্যতম বড় মানবিক সংকট। স্বাস্থ্যখাত নিয়েও তিনি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে কালিগঞ্জ অঞ্চলে একটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল বলে জানান তিনি।
তাঁর মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক পরাজয় সত্ত্বেও তিনি জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “জনগণ আমাকে ভুল বুঝলেও আমি এলাকার উন্নয়নের প্রশ্নে কখনও পিছিয়ে থাকবো না। কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আমি শরিক থাকবো।” স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাজী আলাউদ্দীনের বক্তব্যে যেমন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে, তেমনি রয়েছে উপকূলীয় মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার চিত্র।
বিশেষ করে টেকসই বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো আজও উপকূলের মানুষের প্রধান দাবি হিসেবে রয়ে গেছে। উপকূলের জনপদে রাজনীতির পালাবদল ঘটলেও মানুষের প্রত্যাশা একই রয়েছে—নিরাপদ জীবন, টেকসই উন্নয়ন এবং দুর্যোগ থেকে রক্ষা। আর সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও আলোচিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে আছেন সাবেক এমপি কাজী।







