বিশেষ প্রতিনিধি : শারদীয় দুর্গোৎসবের বিদায়লগ্নেও উৎসবে ভাঁটা পড়ে না বাঙালির প্রাণের টানে। আনন্দ আর ভালোবাসার রঙিন আবেশে পুনরায় প্রমাণিত হলো—দুর্গোৎসব কেবল এক ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ও মিলনের মহাসমুদ্র।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বাইনতলা গ্রামের প্রয়াত মাস্টার মনিমোহন মণ্ডলের প্রতিষ্ঠিত ‘বাইনতলা সর্বজনীন মা দুর্গা মিলন মন্দির’-এ অনুষ্ঠিত হলো এক অভূতপূর্ব বন্ধু-স্বজনদের মিলনমেলা। ইট-কাঠের যান্ত্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে এক বাইনতলা খেয়াঘাটের কাছেই অজপাড়াগাঁয়ের মুক্ত বাতাসে দূর্গাউৎসবের শেষলগ্নে বিকেল বেলা বসেছিল এই নির্ভেজাল প্রাণের আড্ডা। বটবৃক্ষের মতো আগলে রেখে পুরো আয়োজনে মাতৃত্বের স্নেহে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমতী সবিতা রানী মণ্ডল।

আয়োজনের সেই আবেগঘন ক্ষণে থার্ড স্পেস জিমের প্রতিষ্ঠাতা লাভলী দাসের প্রফুল্ল ও হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীর দ্যুতি পুরো মিলনমেলাকে করে তুলেছিল আরও উজ্জ্বল ও ঋদ্ধ; তাঁর সেই স্নিগ্ধ উপস্থিতি যেন উৎসবের প্রাণপ্রবাহে যোগ করেছিল এক অপরূপ নন্দন মাত্রা। মানুষে মানুষে এই অকৃত্রিম আত্মিক টান ও বন্ধুত্বের সৌন্দর্য নিয়ে রুশ সাহিত্যের কালজয়ী লেখক টলস্টয় বলেছিলেন-“জীবনের একমাত্র সত্য সুখ হলো অন্যের জন্য বাঁচার এবং আপন মানুষদের সাথে হৃদয়ের সেতু গড়ে তোলার মধ্যে।”বাইনতলার এই প্রীতি সম্মিলন যেন টলস্টয়ের সেই কথারই এক বাস্তব প্রতিফলন।

উৎসবের এই শেষ লগ্নে বন্ধুদের একঝাঁক প্রতিভাবান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে আড্ডাটি হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। ঢাকার পিজি হাসপাতাল মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুশান্ত মণ্ডল বলেন, “গ্রামের শিকড়ে ফিরে বন্ধু-স্বজনদের এই হাসিমুখগুলোই জীবনের আসল শক্তি।”

ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক রাসেদ আহমেদ খোকা আবেগভরে বলেন, “আজকের এই আন্তরিকতা প্রমাণ করে দুর্গোৎসব সত্যিই আমাদের এক সুতোয় বাঁধে।” বিএনপি নেতা মশিউল হুদা তুহিন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “পলিটিক্যাল বা সামাজিক পরিচয় ভুলে এমন প্রাণের মেলবন্ধন সত্যি দুর্লভ ও আশ্চর্য সুন্দর।” আশাশুনি সরকারি কলেজের জাকির হোসেন বলেন, “শহুরে কোলাহল পেরিয়ে এমন খোলামেলা আলোচনা আমাদের মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।”

ব্যবসায়ী আবিদ এ আজাদ মন্তব্য করেন, “শারদীয়ার বিদায়লগ্নে এত ভালোবাসার সমাগম সত্যি স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।” আশাশুনি পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি তুষার কান্তি বসু বলেন, “গ্রামের মাটিতে প্রতিমা বিসর্জনের ভিড়েও বন্ধুত্বের এমন প্রীতি সম্মেলন উৎসবের আমেজকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।”

উৎসবের আনন্দ যে মানুষকে কাছাকাছি এনে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে, তা উঠে এসেছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরণেও—“মিলনের এই গভীর রসটিই আনন্দের মূল কথা; সেখানে সকল পার্থক্য ভুলে মানুষ মানুষের বুকে টেনে নেয়।”

একইভাবে ভেদভাব ভুলে মানুষের এই প্রীতি ও সৌহার্দ্যের জয়গান গেয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন—“মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।/ তোমায়-আমায় ভালোবাসা নাই কোনো দিন হবে না মান।”

গ্রামের প্রত্যন্ত কোণে অনুষ্ঠিত এই প্রাণবন্ত আলোচনা ও নিখাদ আন্তরিকতা উপস্থিত গ্রামবাসীকে মুগ্ধ ও আপ্লুত করে তোলে। বিজয়ার সুরের মাঝেও এমন উষ্ণ আড্ডা মানুষকে কতটা কাছে টানতে পারে এবং সাধারণ এক দিনকে কতটা অসাধারণ করে তুলতে পারে, বাইনতলার এই মিলনমেলা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *