স্টাফ রিপোর্টার : সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক মো. সারিকুর রহমান ওরফে সারুর বিরুদ্ধে জমির নামজারি, বন্দোবস্তসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী কয়েকজনের দাবি, টাকা দিয়েও তাঁরা প্রত্যাশিত সেবা পাননি। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা।
নগরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসটি নগরঘাটা ও ধানদিয়া ইউনিয়নের ভূমিসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিদিন দুই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষ নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান ও জমির রেকর্ড যাচাইসহ নানা কাজে এ অফিসে আসেন। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, এসব সেবা নিতে গিয়ে তাঁদের অতিরিক্ত অর্থের দাবি ও নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সারিকুর রহমান ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নগরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত ছিলেন। পরে অন্যত্র বদলি হয়ে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৩ সালের মার্চে আবারও ওই অফিসে যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি সেখানে কর্মরত রয়েছেন।
নগরঘাটা ইউনিয়নের মানিকহার গ্রামের বাসিন্দা আন্না বিবির অভিযোগ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পথের জন্য কেনা জমি রেজিস্ট্রি দলিল অনুযায়ী নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে সারিকুর রহমান তাঁর কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা নেন। তবে পরবর্তী সময়ে দলিলে উল্লেখ করা দাগ অনুযায়ী নামজারি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আন্না বিবির ভাষ্য, দলিলে ৫১২৪ ও ৫৪৫২ নম্বর দাগে জমির উল্লেখ থাকলেও নামজারির ক্ষেত্রে একটি দাগে নামজারি করা হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য তাঁকে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্না বিবি বলেন, “আমি গরিব মানুষ। সারিকুর আমার কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখন আবার টাকা চাচ্ছেন। এত টাকা আমি কোথা থেকে দেব?”
একই গ্রামের শেখপাড়ার বাসিন্দা জিয়াউর রহমান শেখের অভিযোগ, বাড়ি নির্মাণের সময় জমি বন্দোবস্ত করে দেওয়ার কথা বলে সারিকুর রহমান তাঁর কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা নেন। তবে এ অর্থ গ্রহণের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জিয়াউর রহমানের দাবি, বর্তমানে বাড়ির প্রাচীর নির্মাণের সময় ভূমি অফিসের মাধ্যমে তাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সারিকুর রহমান তাঁর কাছে গিয়ে আরও ১০ হাজার টাকা দাবি করেন।
জিয়াউর রহমান বলেন, “আমি ভূমিহীন মানুষ। কোথায় যাব, কী করব বুঝতে পারছি না।”
তাঁর স্ত্রী নাছিমা খাতুনের অভিযোগ, ঘর নির্মাণের সময় বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং টাকা দাবি করা হয়েছে। কয়েক দিন আগেও তাঁর কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। এরপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর আবারও ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, সারিকুর রহমান এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে ভয় পান। নতুন ঘরবাড়ি, প্রাচীর কিংবা দোকান নির্মাণ এবং সরকারি জমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে। টাকা দিতে না চাইলে নোটিশসহ বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও দাবি তাঁদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সারিকুর রহমানের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। তাঁর সম্পদের উৎস ও আর্থিক লেনদেন তদন্ত করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ভূমি অফিসের মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়া অর্থ দাবি করা হলে তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অফিস সহায়ক সারিকুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে অন্য একজন ফোনটি রিসিভ করে জানান, সারিকুর রহমান ঘুমিয়ে আছেন, তাই এ মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা বলেন, “তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং অভিযুক্ত কর্মীর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভূমিসেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।







