নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী (২৯ অক্টোবর) উপলক্ষে সাতক্ষীরায় আলোচনা সভা, গুণিজন সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় সাতক্ষীরা শহরের শহীদ নাজমুল সরণিস্থ ম্যানগ্রোভ সভাঘরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সাতক্ষীরা জেলা সংসদ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসক ও সংগীতশিল্পীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা পাঁচ গুণিজনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সাতক্ষীরায় এবারই প্রথমবারের মতো জেলা উদীচীর উদ্যোগে একসঙ্গে ছয় জন গুণিজনকে সংবর্ধিত করা হলো।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সাতক্ষীরা জেলা সংসদের সভাপতি শেখ সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন শেখ মোসফিকুর রহমান মিল্টন ও কবি মৃত্যুঞ্জয় কুমার বিশ্বাস। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন উদীচী সাতক্ষীরা জেলা সংসদের সংগীতবিষয়ক সম্পাদক বিউটি চক্রবর্তী। স্বাগত বক্তব্য দেন উদীচী সাতক্ষীরার সভাপতি শেখ সিদ্দিকুর রহমান শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক সুরেশ পান্ডে।
আলোচনা পর্বে বক্তারা উদীচীর দীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাস, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির ভূমিকা তুলে ধরেন। আলোচনায় অংশ নেন উদীচী সাতক্ষীরা জেলা সংসদের উপদেষ্টা, শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ, সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি ড. আক্তারুজ্জামান, উদীচী সাতক্ষীরার সাবেক সভাপতি ও আবৃত্তিশিল্পী মনিরুজ্জামান ছট্টু, সহ সভাপতি কমরেড আবুল হোসেন, উন্নয়নকর্মী মাধব দত্ত, সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্থার খুলনা বিভাগীয় সভাপতি এস এম আয়ুব আলি, কবি কিশোরী মোহন দাশসহ অন্যরা।
বক্তারা বলেন, উদীচী কেবল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, এটি দেশের গণমানুষের অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের সংগ্রামের অংশীদার। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উদীচী গান, নাটক, কবিতা, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অন্যায়-অবিচার, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে আসছে।
তাঁরা আরও বলেন, সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব, যুক্তিবোধ, প্রতিবাদী চেতনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি জাগিয়ে তোলে। একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়েও উদীচীর আদর্শ ও কর্মসূচি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে উদীচীর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ওপর তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বলেন, গুণী মানুষদের যথাযথ সম্মান জানানো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের জীবনসংগ্রাম, দেশপ্রেম, পেশাগত নিষ্ঠা ও সাংস্কৃতিক অবদান নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। সাতক্ষীরার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানিত করার এই উদ্যোগ স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে ছয় জন গুণিজনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সংবর্ধিত ব্যক্তিরা হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী রিয়াজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোস্তফা নুরুল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. মো. মোসলেম। অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য পরিচিত সাবেক সিভিল সার্জন ডা. এবাদুল্লাহ, বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী আবু আফ্ফান রোজবাবু এবং বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী চৈতালি মুখার্জি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী রিয়াজ মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোস্তফা নুরুল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. মো. মোসলেম মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন। ডা. এবাদুল্লাহ অসহায় ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় বিশেষ ভূমিকা রেখে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। স্বল্পমূল্যে কিংবা সামর্থ্যহীন রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি এলাকায় ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অন্যদিকে, আবু আফ্ফান রোজবাবু ও চৈতালি মুখার্জি সংগীতচর্চা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্বতন্ত্র পরিচিতি অর্জন করেছেন।
সংবর্ধনা পর্বে আয়োজকেরা তাঁদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন। আয়োজকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ, চিকিৎসাসেবা ও সংগীতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা এই ছয়জন গুণী মানুষের সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে সমাজে ইতিবাচক কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।
আলোচনা ও সংবর্ধনা পর্বের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশিত হয়। আবৃত্তি করেন মনিরুজ্জামান ছট্টু, সংগীত পরিবেশন করেন আবু আফ্ফান রোজবাবু, চৈতালি মুখার্জি, ও অদ্বিতীয়া মুখার্জি। তাঁদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সংগীত ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে উদীচীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং মানবিক মূল্যবোধের নানা দিক ফুটে ওঠে।
অনুষ্ঠানে কবি শুভ্র আহমেদ, বাংলাদেশের জাসদ জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক ইদ্রিস আলি, বাসদের জেলা সমন্বয়ক নিত্যানন্দ সরকার, কবি আবু কাজী, নাট্যশিল্পী শেখ আব্দুল ওয়াহেদ, কাজী মাসুদুল হক, মনিরুল ইসলাম, মুনসুর রহমান, মনিরুজ্জামান মুন্নাসহ সাতক্ষীরার বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও উদীচীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়া, গুণীজনদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে উদীচীর অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও প্রগতিশীল চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।







