কালিগঞ্জ প্রতিনিধি : সাতাক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জের পারুলগাছা মৌজায় পৈতৃক সম্পত্তি ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে জয়পত্রকাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চরম স্বেচ্ছাচারিতা, সমন্বয়হীনতা ও ভয়াবহ ‘তদন্ত বাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠেছে। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে একই দাগের জমির ওপর একই ভূমি অফিসের দুজন কর্মকর্তা মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
এক কর্মকর্তার রিপোর্টে যা ‘ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ও ঘেরা-বেড়া দেওয়া জমি’, অন্য কর্মকর্তার কলমের খোঁচায় তা-ই হয়ে গেছে ‘জনসাধারণের চলাচলের পথ’। এদিকে তদন্ত কর্মকর্তা জি.এম. ফয়েজ আহমেদের বিরুদ্ধে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি এবং ঘুষ না পেয়ে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরির বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন এক ভুক্তভোগী। এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও বিচারিক মহলে তীব্র তোলপাড় ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নথি ও প্রাপ্ত তথ্যমতে, পারুলগাছা একদারপুর গ্রামের মৃত আক্কাজ আলী গাজীর ছেলে মোঃ শাহাদাৎ হোসেন (১ম পক্ষ) ও তার প্রতিপক্ষ) মোঃ আবু মুছা (২য় পক্ষ) গংদের মধ্যে আর.এস ৪১ ও ৪২ নং খতিয়ানের ২৮২ দাগের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। আদালতের নির্দেশে প্রথম দফায় তদন্তে আসেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জি.এম. নূরুল ইসলাম।
তিনি সরেজমিনে তদন্ত শেষে স্পষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ১৯৯৫ সালের একটি বণ্টননামা দলিল মূলে শাহাদাৎ হোসেন তাঁর অংশে বাড়ি ও ব্যক্তিগত খরচে ইটের সলিং রাস্তা নির্মাণ করে ভোগদখল করছেন। জমিটি শাহাদাৎ হোসেনের নিজস্ব তারের ঘেরা-বেড়া দিয়ে নিজের আয়েত্বে এবং তাঁর একক বৈধ ভোগদখলেই রয়েছে। অথচ একই দাগ ও সীমানার জমি নিয়ে বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অপর একটি মামলার (নং ১৩২১/২৫) প্রেক্ষিতে তদন্তে যান ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা জি.এম. ফয়েজ আহমেদ। তিনি পূর্বের দাপ্তরিক রেকর্ড ও তদন্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্পূর্ণ উল্টো রিপোর্ট দাখিল করেন।
ফয়েজ আহমেদের রিপোর্টে শাহাদাৎ হোসেনকে ২য় পক্ষ এবং মোঃ রেজাউল বিশ্বাসকে ১ম পক্ষ সাজিয়ে দাবি করা হয়- মেইন রোড থেকে শাহাদাৎ হোসেনের বাড়ি পর্যন্ত ৫০ হাত সলিং রাস্তা সংলগ্ন ৪৫ হাত লম্বা ও ৩ হাত চওড়া একটি কাঁচা রাস্তা রয়েছে, যা রেজাউল বিশ্বাসের পরিবার কবরস্থানে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। প্রথম রিপোর্টে যা শাহাদাৎ হোসেনের ঘেরা-বেড়া দেওয়া নিজস্ব সম্পত্তি ছিল, দ্বিতীয় রিপোর্টে বলা হয় সেখানে শাহাদাৎ হোসেন ‘বেআইনি প্রতিবন্ধকতা’ সৃষ্টি করছেন!
ভূমি কর্মকর্তা ফয়েজ আহম্মেদ কোনো সরকারি আমিন (সার্ভেয়ার) বা ডিজিটাল ম্যাপ জরিপ ছাড়াই তড়িঘড়ি করে এই মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাছাড়া, এই সম্পত্তি নিয়ে বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা (নং ১৩/২৪) চলমান থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় তদন্তে তা সম্পূর্ণ ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
ভূমি অফিসের এই জালিয়াতির বিষয়ে ভুক্তভোগী মোঃ শাহাদাৎ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি পৈতৃক ও বণ্টননামা সূত্রে প্রাপ্ত জমিতে নিজের খরচে রাস্তা করে ভোগদখল করছি। আদালতের নির্দেশে তদন্ত হলেও টাকার খেলায় সঠিক চিত্র উল্টে দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা জি.এম. ফয়েজ আহম্মেদ আমার কাছে সরাসরি ২০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন।
আমি সেই অন্যায় দাবি মেনে ঘুষ দিতে পারিনি বলেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমার তিনটি রেকর্ডীয় দাগের ওপর দিয়ে জোরপূর্বক সম্পূর্ণ জালিয়াতি করে রাস্তা দেখিয়ে রিপোর্ট দিয়েছেন যার খতিয়ান নং ৪৬৮, সাবেক দাগ নং ২১৬, নং দাগে ৩০১ দাগে জমির পরিমান ৫শতক, খতিয়ান নং ৬৩৮, সাবেক দাগ নং ২০৯, হাল নং ২৯৯ দাগে জমির পরিমান ৬শতক ও খতিয়ান নং ৩৫৫, সাবেক দাগ নং ৩১০, হাল দাগ নং ৩০০ দাগে জমির পরিমান ১০ শতক। শুধু তা-ই নয়, এই তদন্ত কর্মকর্তার ইন্ধন ও আশকারা পেয়ে রেজাউল বিশ্বাস গংরা আমার ঘেরা-বেড়া ভাঙচুর করেছে এবং আমাকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিচ্ছে। আমি এখন ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কিত।
“অন্যদিকে, ১ম পক্ষ দাবিদার মোঃ রেজাউল বিশ্বাস বিষয়টি নিয়ে বলেন, “তিনি (শাহাদাৎ) নিজের জায়গা দাবি করলেও এটি মূলত আমাদের বাড়ী যাওয়ার পথ। শাহাদাৎ হোসেন গংরা সেখানে বেড়া দিয়ে আমাদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।”
ঘুষের অভিযোগ এবং একই অফিসের পূর্ববর্তী রিপোর্টের বৈপরীত্য নিয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত জয়পত্রকাটি ভূমি অফিসের তদন্তকারী কর্মকর্তা জি.এম. ফয়েজ আহমেদ সাংবাদিকদের কাছে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি অত্যন্ত দায়সারা ও অহংকারী ভঙ্গিতে বলেন, “আমি সবার উপস্থিতিতে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করেছি। আগের কর্মকর্তা কি রিপোর্ট দিয়েছে, সেটি আমার দেখার বিষয় না। আমি স্পটে যা পেয়েছি, সেই তদন্ত রিপোর্ট অফিসে জমা দিয়েছি।”
ঘুষ দাবির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করলেও ম্যাপ জরিপ ছাড়া কেন প্রতিবেদন দিলেন, তার কোনো আইনি ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। একই দপ্তরের দুই কর্মকর্তার এমন ‘নজিরবিহীন’ ও সাংঘর্ষিক প্রতিবেদনের কারণে বিজ্ঞ আদালতের পক্ষেও সঠিক বিচারিক রায় দেওয়া জটিল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভূমি অফিসের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই ‘তদন্ত বাণিজ্য’ এবং মনগড়া রিপোর্টের কারণেই গ্রামীণ জনপদে মামলা-হামলা ও সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে।
দুটি ভিন্নধর্মী বিতর্কিত তদন্ত প্রতিবেদনই বর্তমানে কালিগঞ্জ সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে জমা আছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপে ল্যান্ড সার্ভেয়ার দ্বারা ম্যাপ পরিমাপপূর্বক একটি নিরপেক্ষ পুনঃতদন্ত এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।







