ডেস্ক রিপোর্ট : স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জেলা-উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে খেলাধূলা চর্চা অব্যাহত রাখতে অনেক ক্লাব গড়ে তোলেন স্থানীয়রা। এর মাধ্যমে তরুণ-তরুƒণীদের মাঝে গড়ে উঠত নেতৃত্ব, সহমর্মিতা আর সামাজিক দায়িত্ববোধ। তবে প্রযুক্তির প্রসার, ব্যস্ততা আর সামাজিক উদাসীনতার পাশাপশি সরকারি বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় অনেক ক্লাব কার্যক্রম চলমান রাখতে পারেনি। অথচও তৎকালীন আলোচিত সরকারের সময়ে ভোটের রাজনীতিতে সেই ক্লাবগুলোর মধ্যে ১০২টি ক্লাব সাতক্ষীরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। ঐ ক্লাবগুলোর অধিকাংশের নেই খেলারমাঠ। এতে হতাশ খেলাধূলা প্রেমীরা।
জানা গেছে, গ্রাম-গ্রামান্তরের মাঠে-ঘাটে-পথে ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি, র্যাগবি, হকি, এ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, খোখো, দাবা, ক্যারাম এর পাশাপাশি ইচিং-বিচিং, হা-ডু-ডু, গোল¬াছুট, কানামাছি, ডাংগুলি, ঘুড়ি, এক্কা-দোক্কা, চড়ুইভাতি, মোরগ লড়াই, ওপেন-টু-বায়োস্কোপ, দোকানপাট, দড়িলাফ, পুতুলখেলা, চোর-পুলিশ, কুতকুত, লাটিম, মার্বেল, দারিয়াবান্ধা, এলাটিং-বেলাটিং, রুমাল চুরি, লাঠিখেলা ও লুকোচুরি প্রভৃতি খেলায় তরুণ-তরুণীরা অংশগ্রহণ করতো।
পরবর্তীতে ঐ অংশগ্রহণকারীরা সংঘবদ্ধভাবে নিজেদের প্রতিযোগিতা ধরে রাখার প্রত্যয়ে ক্লাব তৈরির ভাবনা শুরু করেন। সেই ভাবনা থেকে জেলায় প্রায় ২’শতাধিক ক্লাব গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিভিন্ন কমিটির নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে পি.কে ইউনিয়ন ক্লাব, পার্ক একাদশ, টাউন স্পোটিং ক্লাব, ইয়ং টাউন ক্লাব, সুলতানপুর ক্লাব, ইয়ং সুলতানপুর ক্লাব, অনির্বান সংস্থা, গণমূখী সংঘ, সপ্তগ্রাম রিক্রিয়েশন ক্লাব, লাবসা পল্লী মঙ্গল সমিতি, ইয়ং স্পোটিং ক্লাব, যুব গণমুখী সংঘ, কুখরালী আদর্শ যুব সংঘ, পারুলিয়া যুবক সমিতি, রসুলপুর ক্রীড়া সংস্থা, পলাশপোল ট্রেনিং ক্লাব, রসুলপুর যুব চক্র, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব, পূর্বাচল ক্লাব, সেবা সংঘ, শিল্পী চক্র, এরিয়ান্স ক্লাব, ইয়ং এরিয়ান্স ক্লাব, বলাকা ক্রীড়া চক্র, ইয়ং বলাকা ক্রীড়া চক্র, ইউনাইটেড ক্লাব, হিন্দোল যুব সংঘ চাপড়া, মহমেডান ক্লাব, সবুজ কুখরালী, বাঁকাল প্রভাতী সংঘ, ওরিয়েন্ট ক্লাব, সেতু বন্ধন ক্লাব, ভালুকা চাঁদপুর সবুজ সংঘ, দঃ পারুলিয়া স্পোটিং ক্লাব, নবারুন যুব সংঘ আলিপুর, রাইজিং এরিয়ান্স, জুনিয়ার অনির্বান সংস্থা, কুখরালী ভলিবল স্পোটিং ক্লাব, আজাদ স্মৃতি সংসদ, উদিত সংঘ, জোড়দিয়া মর্ডাণ স্পোটিং ক্লাব, সিলভার স্টার ক্লাব, চিংড়ী বাংলা ক্লাব, ইয়ং মহমেডান ক্লাব, কামালনগর ক্রিকেট ক্লাব, দহকুলা মিতালী সংঘ, নলতা কসমস, টিএন্ডটি ক্লাব, রসুলপুর যুব সমিতি, ক্রিকেট ক্লাব, শহীদ কাজল খোকন স্মৃতি সংসদ, দি অকেশনাল ক্রিকেট এসোসিয়েশন, মুন্সিপাড়া যুব সংঘ, বটতলা ক্রীড়া চক্র, বাঁকাল সুলতান আহমেদ স্মৃতি সংঘ, ইয়ং সিলভার স্টার ক্লাব, গুড়পুকুর আদর্শ সংঘ, সোনালী স্পোটিং ক্লাব, কাটিয়া ক্রীড়া চক্র, আজাদী সংঘ, গাভা ক্রীড়া সংস্থা, শ্যামনগর ক্রিকেট এসোসিয়েশন, গফ্ফার স্মৃতি সংসদ, থানাঘাটা সোনালী সংঘ, উত্তরণ সংঘ, পাটকেলঘাটা ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কালিগঞ্জ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, সাতক্ষীরা ক্রিকেট একাডেমী, সায়ের স্পোটিং ক্লাব, আবহন স্পোটিং ক্লাব, শেখ সামসুর রহমান স্মৃতি সংসদ, ভিক্টোরিয়া স্পোটিং ক্লাব, সিটি ক্লাব, সৈয়দ উদ্দীন স্মৃতি সংসদ, সূর্য তরুন, বঙ্গমাতা ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, ইসু মিয়া স্মৃতি সংসদ, মুনজিতপুর ক্লাব, চলন্তিকা ক্লাব, রয়েল ক্রিকেট একাডেমী, রসুলপুর তরুণ সংঘ, ইউনুছ আলী স্মৃতি সংসদ, শিয়ালডাঙ্গা স্পোটিং ক্লাব, মর্ডাণ ক্রিকেট একাডেমী ক্লাব, ইয়াং স্টার ক্লাব, ডাঃ কিউএ সিদ্দিকী স্মৃতি সংঘ, সীমান্ত ক্রিকেট একাডেমী, শাহ্ স্পোটিং ক্লাব, পালতিবাগান স্পোটিং ক্লাব, মোল্লা স্মৃতি সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাকিম স্মৃতি সংসদ, কাশেমপুর মুক্ত সবুজ সংঘ, কাছারীপাড়া স্পোটিং ক্লাব, ইয়াং মুন্সিপাড়া যুবসংঘ, রফিকুল ইসলাম ওদুদ স্পোটিং ক্লাব, দুর্বার সংঘ, সাতক্ষীরা আবহনী ক্রীড়া চক্র, হাতিরঝিল সোসাইটি, স্টুডেন্টস ক্লাব, সুন্দরবন ক্রিকেট একাডেমী, তুফান স্পোর্টিং ক্লাবসহ ১০২টি ক্লাবকে জেলা ক্রীড়া সংস্থায় অন্তর্ভূক্ত করেন। তবে নামমাত্র কয়েকটি ক্লাবের ক্লাবের মাঠ ও সাইনবোর্ড আছে, বাকিদের অস্তিত্বও নেই।
জেলা তথ্য বাতায়ন সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলা ক্রীড়া সংস্থা জেলার ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে কাজ করে থাকে। এটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধীনে একটি সংস্থা, যা সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম এবং জেলার ৭টি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাকে তত্ত্বাবধান করে। এর অধীনে ৭৫টি ক্লাব/সমিতি/প্রতিষ্ঠান রয়েছে সাতক্ষীরা জেলা।
আরও জানা গেছে, ১৯৫০-এর দশকে স্থানীয় বাসিন্দা কনক চন্দ্র পাল ক্রীড়ায়োজন ও খেলাধুলায় উৎসাহ প্রদানের জন্য তৎকালীন মহকুমা পার্ক কমিটিকে বর্তমান স্টেডিয়ামের অংশবিশেষ অনুদান হিসেবে দেন। পরবর্তীতে নূর আহম্মদ খাঁ, নুরুল ইসলাম খাঁ ও আশরাফ উদ্দিন খান প্রমুখের নিকট থেকে সেই স্থানসংলগ্ন আরও কিছু জমি নিয়ে ১৯৭২ সালে বর্তমান স্টেডিয়ামটি গড়ে তোলা হয়।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার এ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। আর খেলাধুলার জন্য মাঠেরও বিকল্প নেই। তবে জেলা ক্রীড়া সংস্থার অন্তর্ভূক্ত ক্লাবগুলোর অধিকাংশের কোনো মাঠ নেই। অথচ রাজনীতিগতভাবে বিগত কমিটি প্রায় ২৫টি স্পোটস্ ক্লাব/সমিতি/সংঘ এর কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ করে দেয়। সেই প্রেক্ষিতে একটিপক্ষ আদালতে মামলা করেছিলো। মামলাটি বিচারাধীন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে সংস্থার অধীনে ১০২টি ক্লাব রয়েছে। ঐ ক্লাবগুলোর অধিকাংশ ব্যক্তিই একাধিক ক্লাবের সদস্য।
এছাড়া আমার জানামতে ক্লাবের অধিকাংশ কর্মকর্তারা নিজস্ব অর্থায়নে তেমন কোনো খেলা পরিচালনা করেনা, কয়েকটি করেও থাকে বটে। এরমধ্যে কয়েকটি ক্লাব ক্রীড়া সংস্থা কোনো খেলার আয়োজন করলে সেই খেলায় অংশগ্রহণ করে। তবে ক্রীড়া সংস্থা খেলা পরিচালনা করার উদ্যোগ নিলেও পারেনা অর্থের অভাবে। সরকারি বরাদ্দ কম। তবে একটি মিনি স্টেডিয়াম তৈরির কাজ চলমান। এছাড়া উম্মুক্ত মাঠ করার বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন। অনেক অভিভাবক আছে যারা তরুণ-তরুণীদের মাঠে যেতে দেয় না। এটা ভুল। এছাড়া তরুণ-তরুণীদের খেলাধূলার জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম আয়োজন করতে হবে। খেলাধূলা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো, এটা তাদের বুঝাতে পারলেই সমস্যা দূর করা সম্ভব।
এ ব্যাপারে টাউন স্পোটিং ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রাক্তন সাতক্ষীরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য মীর তাজুল ইসলাম জানান, সাতক্ষীরার প্রায় শতাধিক ছেলে-মেয়ে জাতীয় দলের হয়ে খেলাধূলার বিভিন্ন ইভেন্টে নিজেদের নিমিজ্জিত রেখেছে। অথচ স্পোটস্ ক্লাবে ছড়াছড়ি হলেও জেলার অধিকাংশ ক্লাবগুলোর নিজস্ব কোনো খেলারমাঠ নেই, অনেকের মাঠ থাকলেও নিয়মিত অনুশীলন করে না। সেমতে খেলোয়াড়দের ভবিষ্য অন্ধকারের দিকে ধাবিত। তাই, অতিদ্রুত সাতক্ষীরায় ‘ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ’ করা সময়ের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও তিনি সম্প্রতি ক্লাবগুলো প্রতিযোগিতামূলক আসর না বসার পেছনে জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে দায়ী করে বলেন, এই সংস্থায় বছরে ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ আসে। সেই টাকা দিয়ে কিভাবে লীগ খেলবে?
সেজন্য দরকার অন্যান্য ক্লাবের কর্তাব্যক্তিদের সদিচ্ছা। তাহলে ভালো খেলা চালানো সম্ভব। যেমন ধরুন ‘ওয়ারিয়র স্পোটস্ একাডেমী’ ক্রীড়া সংস্থার অন্তর্ভূক্ত নহে, অথচ নিজস্ব অর্থায়নে খেলার উদ্দেশ্যে নেপালে গিয়েছিলো তাদের একদল খেলোয়াড়। এমন অনেক স্পোটস্ ক্লাব রয়েছে। তবে বিভিন্ন ক্লাবের কর্মকর্তারাই খেলার জন্য নহে; বিগতদিনে চেয়ার ও ভোটের রাজনীতি’র জন্য জেলা ক্রীড়া সংস্থায় প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছিলো। অনেক ক্লাব রয়েছে যার সভাপতি থাকেন সাতক্ষীরা শহরে, অথচ ক্লাব নলতা ও পাটকেলঘাটায়? ক্লাবগুলোর প্রতিনিধিদের হীনমন্যতা বন্ধ হলে ক্রীড়াঙ্গন সমৃদ্ধ হবে। প্রাণ ফিরে পাবে খেলার মাঠ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক খেলোয়াড় জানান, বর্তমানে তরুণরা খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিমুখ। এ কারণে আধুনিকায়ন আর মানুষের উৎসাহের অভাবে সাতক্ষীরা থেকে অনেক স্পোটস্ ক্লাবের স্মৃতি পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে সরকারি সহযোগিতা ও ব্যক্তি উদ্যোগে স্পোটস্ ক্লাবগুলোকে ধরে রাখা সম্ভব। সেটি বাস্তবায়ন হলে তরুণ-তরুণীরা মোবাইল গেমে আসক্ত হবে না, পাবে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা।







