আলতাফ হোসেন বাবু : সাতক্ষীরা জেলায় গত ১০ দিনে অন্তত ১২ জনের অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জেলার সদর, তালা, কলারোয়া, আশাশুনি, দেবহাটা, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে।
দৈনিক সাতক্ষীরার সকাল এর বিভিন্ন উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, গত ১ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত এই অপমৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়াজনিত বিরোধ, প্রেমে ব্যর্থতা, মাদকাসক্তি, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, মানসিক অবসাদ, সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে এসব অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
বিশেষ করে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ও দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন অনেককে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একইভাবে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে কঠিন রোগে ভুগে শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক কষ্টে অনেকেই নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মানসিক চাপ বাড়ছে। পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া বা অভিভাবকদের বকুনিতে অভিমান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে, আবার কেউ বিষাক্ত কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে মানসিক চাপ, হতাশা ও পারিবারিক সংকট বাড়তে থাকায় অপমৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো প্রতিরোধযোগ্য ঘটনাগুলোর সংখ্যাও কম নয়।
সমাজবিজ্ঞানী ও সচেতন মহলের অভিমত, অপমৃত্যুর হার কমাতে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা, মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
সমাজকর্মী শেখ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মানসিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এমন অনেক অপমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ।
তথ্যসূত্রে জানাগেছে, গত ১ জুলাই বুধবার সকাল ৯টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে খুলনা-পাইকগাছা মহাসড়কের তালা সদর ইউনিয়নের শাহপুর বাজারে ব্র্যাক অফিসের সামনে তালা উপজেলার নলতা গ্রামের বাসিন্দা এবং রথখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কানাই লাল সরদারের ছেলে বাসচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী স্কুলশিক্ষার্থী কুশল রায় সরদার (১৩) নিহত হয়।
একই দিনে ১জুলাই রাতের যে কোন সময়ে কালিগঞ্জ উপজেলার কুশুলিয়া ইউনিয়নের ঠেকরা-রহিমপুর গ্রামে একটি মাছের ঘের থেকে সঞ্জিব সরকার (৩০) নামে ঘের ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত সঞ্জিব সরকার উপজেলার ঠেকরা-রহিমপুর গ্রামের গোপাল চন্দ্র সরকারের ছেলে। নিহতের পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের ঘের ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে মরদেহ ঘেরে ফেলে রাখা হয়।
৩ জুলাই শুক্রবার দুপুর ১ টার দিকে আশাশুনি উপজেলার শোভনালী ইউনিয়নের খলিসানি গ্রামের সুশান্ত সরকারের স্ত্রী লতিকা সরকার (৪৫) ঘরে ফ্যানের সুইচ অন করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হলে গুরুতর আহত হন। তাকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সযোগে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
৫ জুলাই রবিবার ভোরে কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা ইউনিয়নের শুইলপুর গ্রামের মৃত জগবন্ধু সরকারের ছেলে সুভাষ সরকার (৪৫)’র গলায় ফাঁস দিয়ে রহস্যজনক মৃত্যু হয়। সুভাষ সরকার দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যার কারণে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পাশের একটি আমগাছের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে পান এক প্রতিবেশী।
এ ব্যাপারে কালিগঞ্জ থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা (মামলা নং-৩১) রেকর্ড করা হয়।
৬ জুলাই সোমবার বিকালে আশাশুনি দক্ষিণপাড়ায় আজিজুল ইসলামের স্ত্রী তহমিনা খাতুন (৩৮) বাসার ফ্যানের সুইচ চালু করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত হন। ৭ জুলাই মঙ্গলবার ভোর রাতে কলারোয়া উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের অজিয়ার রহমানের স্ত্রী রহিমা খাতুন (৪৫) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। জানা যায়, সোমবার রাতে রহিমার সাথে তার পুত্রবধূর ঝগড়া হয়। ওই ঝগড়ার জের ধরে স্বামী অজিয়ার রহমানের সাথেও বাকবিতন্ডা হয়। পরে মঙ্গলবার ভোররাতে বাড়ির পেছনে একটি আম গাছে রহিমা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
৮ জুলাই বুধবার সকালে তালা উপজেলার মাছিয়াড়া গ্রামের জোবান ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম (৪০) নিজের ঘের থেকে সকালে বাড়ি ফেরার পথে একটি ঘেরে পড়ে যান, ঘেরের পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়। সূত্র জানায় রবিউল ইসলাম হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন।
একই দিন ৮ জুলাই বুধবার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের পাইকাড়া গ্রামের মৃত ফেরাসতুল্লা গাজীর ছেলে মোশাররফ হোসেন (৬০) বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হন। মিস্ত্রির কাছ থেকে মেরামত করে আনা একটি পুরোনো টেবিল ফ্যান সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাড়িতে মাল্টিপ্লাগে সংযোগ দেওয়ার সময় তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্বজনরা দ্রুত তাকে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের প্রসাদপুর গ্রামের হারুন-অর-রশিদের স্ত্রী রুমি আক্তার (২৮) ভ্যান যোগে তালা থেকে আঠারোমাইল যাওয়ার পথে শাহাপুর বাজার এলাকায় পৌঁছালে যমুনা লাইন (ঢাকা মেট্রো-১৩-২৬-৯০) পরিবহনের যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
এদিকে, সদর উপজেলার আলিপুর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড কুলপোতায় ৩ দিন উধাও হয়ে যাওয়া পর আব্দুর রহমান (১৫)’র লাশ মৎস্য ঘের থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। আব্দুর রহমান কুলপোতা গ্রামের সফিকুল ইসলামের ছেলে। গত ১০ জুলাই শুক্রবার ভোরে নিহতের খালু নুর ইসলাম তাদের বাড়ির পিছনে বাথরুমে যাওয়ার সময় দেখতে পান বসত বাড়ির পিছনে রবিউল ঢালীর ঘেরের পানির মধ্যে তার লাশ ভাসতে দেখতে পান। ঘটনার সংবাদ পুলিশকে জানালে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।
নিহতের মা শিল্পী খাতুন জানান, ৮ জুলাই বুধবার সকাল ১১টা হতে আব্দুর রহমানকে হঠাৎ করে পাওয়া যাচ্ছিল না, অনেক খোঁজাখুজির পর তাকে সন্ধান না পাওয়ার কারণে ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি নিখোঁজের জিডি করে। ৩ দিন তাকে কোথাও খোঁজ খবর না পাওয়ার পর হঠাৎ ১০ জুলাই ভোরে তাদের বাড়ির পিছনের ঘেরের পানিতে তার লাশ ভাসতে দেখা যায়। কি কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, তা কারো জানা নেই। তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য থেকে যায়।
১০ জুলাই শুক্রবার ভোর রাতে কলারোয়া উপজেলার লাঙ্গলঝাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তৈলকুপি গ্রামের মৃত শামসের আলির ছেলে সম্রাট আকবর (৩২) নিজ বাড়ির পাশে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একটি গাছে গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। সকালে পরিবারের লোকজন দেখতে পেয়ে থানা পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যায়নি।
একই দিনে, ১০ জুলাই শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাড়দ্দহা গুচ্ছগ্রামে আমেনা খাতুন (৩০) নামের গৃহবধূ নিহত হন। তিনি ভোমরা লক্ষ্মীদাড়ি গ্রামের বাহার আলি দফাদারের মেয়ে।
এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা জানান, আমেনার স্বামী হানিফ মাদকাসক্ত। বিয়ের পর থেকে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ চলতো। মারধর চলতো। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার দুপুরে হানিফ ঘরে বসে মাদক সেবন করছিলো। স্ত্রী তাতে বাধা দিলে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে হানিফ তাকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধে হত্যা করে।







