বিশেষ প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আর জীবিকাগত সংকটে যখন সুন্দরবনের মৎস্যজীবীরা নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উপকূলীয় প্রতিবেশ সুরক্ষাকে সামনে রেখে এক গুরুত্বপূর্ণ শিখন বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ব¬ু-কার্বন প্রতিবেশ সুরক্ষা প্রকল্প’-এর আওতায় আয়োজিত এ সভায় জলবায়ু অভিযোজন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের নানা অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণ বিনিময় করা হয়।

সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের জন্য টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ব¬ু-কার্বন প্রতিবেশ সুরক্ষা প্রকল্প’-এর শিখন বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সকালে শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স-এর আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহযোগিতা করে মেরিডিয়ান ইনস্টিটিউট, এবং গবেষণা সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউল্যাব।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক। তিনি বলেন, “সুন্দরবন শুধু একটি বনাঞ্চল নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাকৃতিক প্রতিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ব¬ু-কার্বন সুরক্ষা প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর সমাধানের পথ দেখাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, সরকারি দপ্তর, এনজিও ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলকে জলবায়ু সহনশীল করা সম্ভব নয়। এ ধরনের প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আকারে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সভায় সভাপতিত্ব করেন লিডার্স-এর সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, “লিডার্স দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করছে। ব¬ু-কার্বন প্রতিবেশ সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন সুন্দরবনের প্রতিবেশ রক্ষা করছি, অন্যদিকে মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প ও টেকসই জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করছি।”

তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভায় বক্তব্য রাখেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসেন। তিনি বলেন, “নদীভাঙন ও লবণাক্ততা উপকূলীয় এলাকার বড় সমস্যা। পরিকল্পিত ম্যানগ্রোভ বনায়নের মাধ্যমে নদীর চর ও তীর সংরক্ষণ করা গেলে ভূমি ও জীববৈচিত্র্য উভয়ই সুরক্ষিত থাকবে।”

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তহিদ হাসান বলেন, “অপরিকল্পিত আহরণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং টেকসই আহরণ পদ্ধতি প্রচলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

সমাজসেবা কর্মকর্তা এসএম দেলোয়ার হোসেন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। এই প্রকল্প সামাজিক সুরক্ষা ও জীবিকা উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকে যুক্ত করেছে, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।”

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, “পরিবেশের অবক্ষয় সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। জলবায়ু সহনশীল পরিবেশ গড়ে উঠলে উপকূলীয় এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমবে।”

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, “পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তুলতে এ ধরনের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে।”

সভায় জানানো হয়, প্রকল্পটির আওতায় ব¬ু-কার্বন সুরক্ষা ও বনায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে নদীভাঙন রোধ ও উপকূলীয় প্রতিবেশ সুরক্ষায় ২ একর ৪৯ শতক নদীর চরে পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে কার্বন সংরক্ষণ বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

লিডার্স উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই জীবিকা উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য সমন্বিত ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সভায় প্রকল্পের অগ্রগতি, বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা, শিক্ষণ ও অর্জিত সাফল্যসমূহ অংশীজনদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণের আলোকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক সুপারিশ গ্রহণ করা হয়।

শিখন বিনিময় সভায় শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা, সংশি¬ষ্ট স্টেকহোল্ডার, বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধি, বন বিভাগ, উপকারভোগী মৎস্যজীবী ও সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা এ ধরনের উদ্যোগ সুন্দরবন ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সভা শেষে অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে একটাই প্রত্যাশা—সুন্দরবন যেন শুধু মানচিত্রের সবুজ রেখা হয়ে না থাকে, বরং টিকে থাকুক মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে। নদী, বন ও মানুষের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার যে প্রয়াস এই ব¬ু-কার্বন প্রতিবেশ সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতের উপকূল রক্ষার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

স্থানীয় জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ যদি অব্যাহত থাকে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মাঝেও সুন্দরবনের মৎস্যজীবীরা ফিরে পেতে পারেন টেকসই জীবিকার আশা। এই শিখন বিনিময় সভা তাই শুধু অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির আয়োজন নয়, বরং একটি নিরাপদ ও সহনশীল উপকূল গড়ে তোলার প্রতিশ্র“তিরও প্রতিফলন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *