বিশেষ প্রতিনিধি : সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের আইন সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সাতক্ষীরায়। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে আয়োজিত এক গুরম্নত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় উঠে আসে লিগাল এইড কার্যক্রমের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ।
ন্যায়বিচারের পথে প্রাšিত্মক মানুষের বাধা দূর করতে করণীয় বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয় এই আয়োজনে। সহিংসতা প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির অঙ্গীকারে একত্রিত হন জেলার গুরম্নত্বপূর্ণ বিচারিক ব্যক্তিত্বরা। মানুষের আস্থার জায়গা শক্ত করতে লিগাল এইড কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ রূপরেখাও আলোচনায় স্থান পায়।
সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের আইন সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এক গুরম্নত্বপূর্ণ জনসচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা। শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকাল ১১টা থেকে সারাদিনব্যাপী সাতক্ষীরা জেলার মোজাফফর গার্ডেন অডিটরিয়ামে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং জেলা লিগাল এইড কার্যালয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় জেলার বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ প্রায় শতজন বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন। সভায় জেলা লিগাল এইড কার্যক্রমের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা জেলার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরম্নল ইসলাম। সভাপতির বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরম্নল ইসলাম বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে কেবল আদালত নয়, সমাজের প্রতিটি ¯ত্মরকে একসাথে কাজ করতে হবে।
যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে আমি সকলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে আগ্রহী। সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু ঘটনার পর নয়, ঘটনার আগেই সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যšত্ম জরম্নরি। একটি ভিকটিম যেন যথাযথ আইনি সহায়তা পায়, সেজন্য আলামত সংগ্রহের বিষয়ে শুরম্ন থেকেই সচেতন হতে হবে। আইন সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের একটি গুরম্নত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব বাস্তবায়নে বিচার বিভাগ সবসময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
তিনি আরও বলেন, লিগাল এইড কার্যক্রম মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় অপরিহার্য। সমাজে সহিংসতা ও অন্যায় কমাতে হলে নৈতিকতা, মানবিকতা ও আইনের শাসন এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরম্নত্ব দিতে হবে।
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন সিনিয়র চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, লিগাল এইড সম্পর্কে অনেক মানুষ এখনও জানেন না। আদালত ও প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ভুক্তভোগীরা যদি শুরম্নতেই সঠিক তথ্য ও সহায়তা পান, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়। আইন সহায়তা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রণব কুমার হুই বলেন, বিচারপ্রাপ্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভয় ও অজ্ঞতা। লিগাল এইড কার্যক্রম সেই ভয় কাটাতে সহায়তা করছে। প্রাšিত্মক মানুষের কাছে আইনের ভাষা সহজ করে পৌঁছে দিতে পারলেই এ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।
অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ গৌতম মল্লিক বলেন, ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের আস্থা অর্জনই হলো প্রকৃত বিচার। লিগাল এইড কার্যক্রম সেই আস্থা তৈরিতে গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে সমাজে শিশুদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, যা অত্যšত্ম উদ্বেগজনক। এটি কমাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনকে একসাথে কাজ করতে হবে। শিশুদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিন চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব। লিগাল এইড কার্যক্রম পুলিশের কাজকে আরও গতিশীল করতে সহায়তা করছে।
সভাটির সার্বিক সঞ্চালনায় ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার শিল্পী শর্মা। তিনি বলেন, আইন সহায়তা যেন কাগজে-
কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বা¯ত্মবে মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। এটাই আমাদের লক্ষ্য। নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশু নির্যাতন ও সামাজিক অন্যায়ের বিরম্নদ্ধে লিগাল এইড কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। প্রকল্প বিষয়ে বি¯ত্মারিত তুলে ধরে নেদারল্যান্ড’র তেরে দেশ হোমস প্রতিনিধি নুরম্নল কবির বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। স্থানীয় পর্যায়ে লিগাল এইড কার্যক্রম শক্তিশালী হলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এ উদ্যোগের পাশে থেকে আমরা ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখব।
মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা লিগাল এইড কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ, তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করেন। সভা শেষে সভাপতির পক্ষ থেকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো হয়।
মতবিনিময় সভাটি শেষ হয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে।
অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, লিগাল এইড কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে আরও বি¯ত্মৃত হলে প্রান্তিক মানুষ আইনের সুরক্ষা সহজেই পাবে। সহিংসতা প্রতিরোধে আগাম সচেতনতা সৃষ্টি ও দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুররম্নত্বারোপ করা হয়। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত উদ্যোগই পারে সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করতে। সভায় উত্থাপিত সুপারিশগুলো বা¯ত্মবায়িত হলে ন্যায়বিচারের পথ আরও সুগম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের এই সম্মিলিত প্রয়াস সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তুলবে। ন্যায়বিচার তখন আর কেবল আদালতকেন্দ্রিক থাকবে না, পৌঁছে যাবে মানুষের ঘরে ঘরে।







