শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জে পরিতোষ বৈদ্য নামে এক হিন্দু যুবকে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সাথে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, জুতাপেটা করা এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

গত এক সপ্তাহ ধরে ভুক্তভোগী তাকে মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমোতে প্রতিনিয়ত এই ধরনের হুমকি দিয়ে আসছে সেন্ট্রাল কালিনগর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে মাসুম।

ভুক্তভোগীর কাছে আসা হুমকিমূলক বার্তার রেকর্ড ও স্ক্রিনশট থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত মাসুম অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করাসহ বলছে— “তুই রেডি থাক, তোকে বাংলাদেশে থাকতে দেওয়া হবে না। তুই শ্যামনগরে আয়, কলেজের ছেলেদের দিয়ে জুতাপেটা করব।” এছাড়া তাকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলে পাঠানোর হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এসব থেকে রেহাই পেতে মাসুম তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা ও একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন দাবি করছে।

ভুক্তভোগী পরিতোষ কুমার বৈদ্য ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আড়পাঙ্গাসিয়া গ্রামের এক প্রতিবন্ধী শিক্ষকের মেয়ে মুন্সিগঞ্জ বাজারের ‘মাসুম কম্পিউটার অ্যান্ড ফটোস্ট্যাট’ দোকানে কম্পিউটার শিখতে আসত। সেই সুবাদে মেয়েটির সাথে মাসুমের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। এর জের ধরে গত কিছুদিন আগে গভীর রাতে ওই মেয়েটিকে তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা করে মাসুম। তখন এলাকাবাসী তাকে হাতেনাতে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। পরবর্তী দিন স্থানীয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের মধ্যস্থতায় মুছলেকে নিয়ে মাসুমের বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে তাকে হস্তান্তর করে।

পরিতোষ বৈদ্য আরো বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারটি আমার আত্মীয় হওয়ায় আমি মানবিক কারণে তাদের আইনি ও সামাজিকভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। আর এতেই মাসুম আমার ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয়। কিছুদিন আগে আমার অফিসে যাওয়ার পথে সে আমাকে উত্যক্ত করার চেষ্টা করে। তাতে সুবিধা করতে না পেরে সরাসরি আমার কাছে ৪০ হাজার টাকা ও একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন দাবি করে। আমি এই অনৈতিক দাবি পূরণ করতে অস্বীকৃতি জানালে সে আমাকে মারতে উদ্যত হয়।”
এই ঘটনার পর নিরাপত্তা চেয়ে আমি শ্যামনগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করি। কিন্তু অভিযোগের পর মাসুমের ঔদ্ধত্য আরও বেড়ে যায়। সে আইনের তোয়াক্কা না করে থানায় হাজির না হয়ে উল্টো অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীকে অবিরত হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে।

একটি স্বাধীন দেশে একজন সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য তথা সংবাদকর্মীর ওপর এমন বর্বর হুমকি ও চাঁদাবাজির ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ, শ্যামনগর শাখার আহ্বায়ক অনাথ মন্ডল এই ঘটনাকে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি অবিলম্বে দোষী মাসুমকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।

অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিতে মাসুম এর কাছে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। পূর্বে এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। সে সময় আমি থানায় হাজির হয়েছিলাম তবে পরিতোষ বৈদ্য হাজির হননি। পরবর্তীতে আমার বিরুদ্ধে যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে সেটিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি তাকে কোনো ধরনের হুমকি দিইনি।

হুমকির অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনশট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন যে মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ আইডি থেকে বার্তা পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো আমার নয়। আমি এমন কোনো বার্তা পাঠাইনি।

শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) মোঃ খালেদুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে সংবাদকর্মী পরিতোষ বৈদ্য শ্যামনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এরপরও যদি তাকে পুনরায় হুমকি দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সচেতন মহল ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল মাধ্যমে এভাবে হুমকি ও মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ২৪ ও ২৯ ধারা এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৫০৬ ধারা (ফৌজদারি হুমকি) অনুযায়ী কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মাসুম এই আইন সুস্পষ্ট লংঘন করেছে। এজন্য তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *