মেহেরুননেসা মিম : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লোনা পানির তীব্র আগ্রাসন ও আবাদি জমি ধ্বংস হওয়ায় সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে বিকল্প জীবিকার পথ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এর ওপর সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে বননির্ভর পরিবারগুলোতে।

এই জলবায়ু সংকট ও নিষেধাজ্ঞাজনিত বেকারত্বের জোড়া ধাক্কায় পুরুষেরা যখন দিশেহারা বা কাজের খোঁজে পরিযায়ী হতে বাধ্য হচ্ছেন, তখন তীব্র মজুরি বৈষম্য ও শারীরিক শ্রম সহ্য করেই উপকূলের সংসারের হাল ধরছেন নারীরা।

শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকার রহিমা খাতুন এই জলবায়ু ও পেশাগত সংকটের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্বামী গোলাম রসুল সুন্দরবন-নির্ভরশীল একজন জেলে। বনের পাস-পারমিট বা প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকলে সরকারি নিষেধাজ্ঞার মুখে সালাম কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে থাকতে বাধ্য হন। কিন্তু পরিবারের দৈনন্দিন ক্ষুধা কিংবা এনজিও ও মহাজনের ঋণের কিস্তি তো আর নিষেধাজ্ঞা বোঝে না।

রহিমা খাতুন বলেন, “বন বন্ধ থাকলে স্বামী কাজ পায় না। কিন্তু সংসারের খরচ আর ঋণের কিস্তি ঠিকই চালানো লাগে। জলবায়ুর পরিবর্তনে আগে মিষ্টি পানিতে ধান হতো, এখন লোনা পানির কারণে আবাদি জমি শেষ। বিকল্প কাজ বলতে শুধু ঘেরের শারীরিক শ্রমই বাকি আছে। তাই বাধ্য হয়ে আমাকেই রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পরের চিংড়ি ঘেরে ‘জোন’ (মজুরি) দিতে হয়।”

জোয়ার-ভাটার ভাগ্য ও নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা : সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটায় নির্ধারিত হয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য। বনের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বছরে দু’দফায় (জুন থেকে আগস্ট-তিন মাস পর্যটনসহ সব বনজ সম্পদ এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-দুই মাস কাঁকড়া আহরণ) প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখে বন বিভাগ। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা থাকে।

তবে বনজীবীদের অভিযোগ, সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বন বা সাগরে যাওয়া বন্ধ হলে উপকূল জুড়ে নামে নীরব অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সংকটকালে স্থানীয় বাজারে বিকল্প কাজ বা নির্দিষ্ট দক্ষতার অভাবে অধিকাংশ পুরুষ পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়লে পরিবারের টিকে থাকার মূল দায়িত্ব এসে পড়ে নারীদের কাঁধে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিবন্ধিত জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালীর সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন হলেও পরোক্ষভাবে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ এই বনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণার কথা মাথায় রেখে বছরের নির্দিষ্ট সময় সম্পদ আহরণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকে। জুন, জুলাই ও আগস্ট-এই তিন মাস সুন্দরবনের পর্যটনসহ সব বনজ সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি-এই দুই মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও মাছসহ অন্যান্য সম্পদ আহরণ চালু থাকে।

অদক্ষতা, কাজের অভাব ও নারী শ্রমের চরম শোষণ : মুন্সীগঞ্জ এলাকার বনজীবী নেপাল সানা তাঁর কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে শুধু সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরি। অন্য কোনো কাজের দক্ষতা আমাদের নেই। ঘেরে কাজের সুযোগ সীমিত এবং মজুরিও কম। ফলে পরিবারের পুরুষরা খুলনা বা ঢাকায় রিকশা চালানো বা ইটভাটায় না গেলে কাজ পায় না। বাধ্য হয়ে পরিবারের নারীদের দিনমজুরি দিতে পাঠাতে হয়।”

উপকূলীয় এই সংকটে নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হলেও তা জন্ম দিচ্ছে চরম শ্রম শোষণের। শেফালী বিবি, রহিমা বুলি দাসীসহ একাধিক স্থানীয় নারী শ্রমিক জানান, যে কাজের জন্য একজন পুরুষ দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে একই শারীরিক পরিশ্রমের কাজে নারীদের দেওয়া হয় মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। মজুরি কম হওয়ায় স্থানীয় ঘের মালিকরাও পুরুষ শ্রমিকের বদলে নারী শ্রমিক নিতে বেশি আগ্রহী হন। পরিবারের অন্ন সংস্থান ও মহাজনের কিস্তির তাগিদই তাঁদের এই বৈষম্যমূলক কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করে।

দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শেফালী বিবি বলেন, “উপকূলীয় পুরুষেরা জন্মগতভাবেই সুন্দরবনের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। বনে প্রবেশ বন্ধ থাকলে তারা বিকল্প কাজে যুক্ত না হয়ে অলস সময় পার করেন। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার ও নারীদের ওপর। পুরুষেরা তাস খেলে বা সময় কাটালেও সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ মেটাতে নারীদের চরম হিমশিম খেতে হয়। অনেকেই ইটভাটা, মাটি কাটা বা ভ্যান চালানোকে মান-সম্মানের পরিপন্থী মনে করেন বা শারীরিক ধকল সহ্য করতে পারেন না।”

মজুরি বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “ঘেরের কাজে পুরুষ শ্রমিকেরা দিনে সাড়ে চারশত টাকা পেলেও নারীদের দেওয়া হয় মাত্র দুইশত থেকে আড়াইশত টাকা। অথচ অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা কাজ বেশি বোঝেন ও করেন। বিকল্প কাজ না করায় পরিবারে অভাব-অনটন ও সহিংসতা লেগেই থাকে।”

নিবন্ধিত বনাম অনিবন্ধিত জেলে: সহায়তা ও কার্ডের বৈষম্য : উপকূলীয় অঞ্চলে বনজীবী ও জেলেদের সরকারি সহায়তা প্রাপ্তিতে রয়েছে বড় সমন্বয়হীনতা। জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে যান, যাদের মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে সবচেয়ে বেশি—৭ হাজার ৩৫৫ জন। সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকাকালীন ৫৮ দিনের জন্য ১২ হাজার ৮৭৯ জন নিবন্ধিত জেলেকে প্রতি মাসে ভিজিএফ চাল হিসেবে মোট ৭৭.৩৩ কেজি করে দেওয়া হয়।

তবে স্থানীয় জেলে ও ট্রলার মালিক সমিতির মতে, জেলায় প্রকৃত জেলের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। ফলে এক লাখেরও বেশি অনিবন্ধিত জেলে সরকারি ভিজিএফ সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

দাতিনাখালী গ্রামের অনিবন্ধিত জেলে শাহজাহান সরদার বলেন, “যাদের কার্ড আছে তারাই সাহায্য পায়। বছরের পর বছর ধরে পেশায় থেকেও আমি কার্ড পাইনি। বন্ধের দিনগুলোতে কাজ না পেয়ে চরম কষ্টে দিন কাটায়।”

অন্যদিকে সহায়তা পাওয়া নিবন্ধিত জেলে আজগর আলী জানান, “পাঁচ সদস্যের পরিবার চাল দিয়ে তো আর পুরো মাস চলে না। চালের সাথে তেল, ডাল বা নুন কেনার টাকা থাকে না, তাই আবার দাদন বা ঋণ নিতে হয়।”

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, “নিবন্ধিত জেলের বড় অংশকে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। চালের পাশাপাশি ডাল, তেল বা আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস অন্তর্ভুক্ত করার লিখিত প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া জেলে কার্ড এবং বন বিভাগের বিএলসি’র (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) ডেটাবেজে সমন্বয়ের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিতদের তালিকাভুক্ত করা হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ করা হবে।”

জলবায়ু প্রাক প্রেক্ষাপট ও টেকসই সমাধানের দাবি : সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লোনা পানির আগ্রাসনে উপকূলীয় অঞ্চলের আবাদি জমি ও কাজের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। পুরুষরা কাজের খোঁজে পরিযায়ী হয়ে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুর’ মতো জীবন কাটাচ্ছেন, আর তাঁদের অনুপস্থিতি ও বেকারত্বের সময়ে পুরো সংসারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছেন এই উপকূলের নারীরাই।

স্থানীয় সুন্দরবন গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টুর মতে, বিকল্প কাজের সুযোগ না থাকায় বনজীবীরা দাদনচক্র বা মহাজনী ঋণের জালে আটকে পড়ছেন। সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের বরাদ্দ সাধারণ বনজীবীদের কাছে এখনো অপ্রতুল।

মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত জানান, “শুধু চাল দিয়ে উপকূলীয় পরিবার বাঁচতে পারে না। নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবারপ্রতি চালের পাশাপাশি অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া জরুরি। সেই সাথে মৎস্যজীবী-বান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প ও বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টি না করলে নারীদের এই চরম শ্রম শোষণ বন্ধ হবে না।”

সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন বলেন, “বন বিভাগের বিএলসি অনুযায়ী সরাসরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে তা হবে শতভাগ নির্ভুল। বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দিয়ে মাছ-কাঁকড়া চাষ ও হাঁস-মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে খাদ্য, মৎস্য ও বন বিভাগের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং দাদন চক্র নিরসনে বিশেষ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই মানবিক সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *