জিএম আমিনুল হক : ভোরবেলা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে গাছি নামছেন গাছ থেকে, কাঁধে রসের হাঁড়ি। বাংলার শীতের এই চিরাচরিত দৃশ্যটি এখন সাতক্ষীরার গ্রামগুলোতেও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। মাঘের শেষ লগ্ন, শীত বিদায়ের ঘণ্টা বাজলেও এবার সাতক্ষীরার অধিকাংশ মানুষের পাতে পড়েনি কাঙ্খিত সেই খেজুরের রস। এক সময়ের বিখ্যাত ‘সাতক্ষীরার যশ, তাল-খেজুরের রস’ প্রবাদটি এখন কেবলই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিতে চলেছে।

ইটভাটায় পুড়ছে ঐতিহ্য গ্রামের মেঠোপথ, পুকুরপাড় বা খেতের আইল। যেখানে একসময় সারি সারি খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে থাকত, সেখানে এখন শ্মশানের নীরবতা। নির্বিচারে গাছ কেটে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার, গত দুই দশকের স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়ে জনপদটি এখন বৃক্ষশূন্য। বালিথা গ্রামের রাজ্জাক মিঞার আক্ষেপ, “বাড়িতে ১০-১২টি গাছ আছে, কিন্তু রস নামানোর মতো গাছি নেই। এক ভাড় রস এখন ২০০-৩০০ টাকা, তাও মেলে না।”

হারিয়ে যাচ্ছে স্বাদ ও ঘ্রাণ। কোমরপুর গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক জাহাঙ্গীর কবীর স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, “আগে শীতের সকালে রস জ্বালানোর মৌ মৌ গন্ধে ঘুম ভাঙত। নলেন গুড় আর পাটালির সেই স্বাদ এখন রূপকথা মনে হয়। গত কয়েক বছর নলেন গুড়ের পিঠা খাওয়া ভাগ্যে জোটেনি।” গাছির সংখ্যা কমে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গাছের জীবনশক্তি কমে যাওয়ায় রসের পরিমাণও গেছে কমে। যেখানে আগে এক কাঁটায় দুই ভাড় রস হতো, এখন সেখানে অর্ধেক পাওয়াই দুষ্কর।

সংস্কৃতির সেই পিঠাপুলির উৎসব শীত মানেই ছিল ঢেঁকিতে চাল কোটার শব্দ আর খেজুর রসে ভেজানো পিঠার মহোৎসব। জিরেন রস দিয়ে নলেন গুড়, দানাগুড় আর ওলা রস দিয়ে তৈরি ঝোলা গুড় ছিল শীতকালীন আভিজাত্যের অংশ। গ্রামবাংলার সন্ধ্যায় একদিকে চলত কবিগান, অন্যদিকে চলত হরেক রকম পায়েস তৈরির ধুম। সচেতন মহল মনে করছেন, এখনই যদি পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নলেন গুড় কিংবা পিঠা-পুলি কেবল ইতিহাসের পাতায় বা ছবির ফ্রেমে আটকে থাকবে।

প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, গাছ কাটা ও রস সংগ্রহের কাজটি একটি নিপুণ শিল্প। গাছিরা অত্যন্ত ধৈর্য ও নৈপুণ্যের সঙ্গে গাছের বুক চিরে শুভ্র সাদা অংশ বের করে রস আহরণ করেন। কিন্তু এই শিল্পীদের কদর কমছে, কমছে গাছের সংখ্যাও। সাতক্ষীরার এই সোনালী ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয় সচেতন মানুষ।

আগের মতো সেই ধোঁয়া ওঠা নলেন গুড়ের ঘ্রাণ কি তবে আর ফিরবে না সাতক্ষীরার বাতাসে? প্রশ্নটি এখন সাধারণ মানুষের মনে বড় হয়ে বিঁধছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *