মোড়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাট-বাজার সর্বত্রই আলোচনা কে হচ্ছেন মেম্বার চেয়ারম্যান প্রার্থী?
জি এম আমিনুল হক : আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন-২০২৬ কে ঘিরে সাতক্ষীরা জেলায় রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। এখনো তফসিল ঘোষণা হয়নি, তবে জেলার ৭টি উপজেলার ৭৮টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, গণসংযোগ আর শো-ডাউনে সরগরম হয়ে উঠেছে পুরো জনপদ। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ইউনিয়নের হাট-বাজার, মসজিদের আঙিনা, স্কুলের মাঠ-ঘাট,খালবিল সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা, কে হচ্ছেন আগামীতে মেম্বার- চেয়ারম্যান?সাধারণ ভোটাররা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে।কারণ তাদের ভোটে নির্বাচিত হয় গ্রামের মেম্বার ও চেয়ারম্যান।
সাতক্ষীরা সদরের ফিংড়ী,ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর, বাঁশদহা, কুশখালী, লাবসা,আগরদাড়ী,ভোমরা আলীপুরসহ কলারোয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। সকাল হলেই চায়ের দোকানে ভিড়। হাতে চায়ের কাপ, মুখে একটাই প্রশ্ন— এবার কে কে দাঁড়াচ্ছে মেম্বর ও চেয়ারম্যান পদে?
সদরের ফয়জুল্যাপুর গ্রামের বাসিন্দা আ: রহমান জানান- ভোট আসলে গরীবের দাম বাড়ে,সবাই ভোট চাইতে আসে, নানান ওয়াদা করে কিন্তু বাস্তবে ভোটের পর আর তাদের খোঁজ মেলে না। অনেক ভোট দিয়েছি, সবাই ভোটের পর আর আগের কথা মনে রাখে না। বাঁশদহা বাজারের চা দোকানি রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগে সকাল বেলা মানুষ ক্ষেত-খামারের গল্প করতো। এখন নির্বাচনের গল্প। কে কতটা উন্নয়ন করেছে, কার জনপ্রিয়তা বেশি, এইসব নিয়েই তর্ক চলে সারাদিন।”
ধুলিহরের এক প্রবীণ ভোটার আবুল হোসেন বলেন, গতবার আমরা রাস্তা-ঘাটের জন্য ভোট দিছিলাম। এবার আমরা দেখবো কে জলাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করবে। বিলে পানি আটকে আমাদের ফসল নষ্ট হচ্ছে। যে এই সমস্যার সমাধান দেবে, আমরা তার পক্ষেই যাবো।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তরুণদের অংশগ্রহণ। মাঠে দেখা যাচ্ছে, পুরোনোদের পাশাপাশি অনেক শিক্ষিত ও তরুণ মুখ এবার মেম্বার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবে সরব। নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ এলাকার সমস্যা নিয়ে ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন।
শ্যামনগর থেকে আসা এক তরুণ প্রার্থীর সমর্থক বলেন, আমরা চাই ডিজিটাল ইউনিয়ন। জন্ম নিবন্ধন, নাগরিক সনদ নিতে যেন হয়রানি না হতে হয়। তরুণরা সেটা পারবে।
অন্যদিকে, বর্তমান মেম্বার- চেয়ারম্যানরাও বসে নেই। তারা তাদের গত ৫ বছরের উন্নয়ন কর্মকান্ড— রাস্তা, কালভার্ট, স্কুল-মাদ্রাসার উন্নয়ন, ভিজিডি-ভিজিএফ বিতরণের হিসাব তুলে ধরে ভোট চাইছেন।
সাতক্ষীরার ইউনিয়নগুলোতে ঘুরে ভোটারদের সাথে কথা বলে যে ৫টি প্রধান দাবি উঠে এসেছে তা হলো – সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া,পাটকেল ঘাটা, তালা ও আশাশুনি উপজেলার বিল অঞ্চলে অপরিকল্পিত মৎস্য ঘেরের কারণে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। হাজার হাজার বিঘা জমি পানির নিচে। এটি এখন এক নম্বর ইস্যু।
রাস্তা-ঘাট ও ড্রেনেজ না থাকাসহ অনেক ইউনিয়নের গ্রামীণ রাস্তা এখনো কাঁচা। বর্ষায় কাদায় চলাচল করা যায় না।
স্বচ্ছতা ও হয়রানি মুক্ত সেবা চান ভোটাররা।তারা জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিক সনদ পেতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পুরোনো। ভোটাররা এর অবসান চান।
মাদক ও চুরি-ছিনতাই রোধে জনপ্রতিনিধিরা পদক্ষেপ নিতে পারলেও অতীতে তাদের দৃষ্টান্ত মুলক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। যেহেতু আমাদের সীমান্তবর্তী ইউনিয়নগুলোতে মাদক একটি বড় সমস্যা। কৃষকের ন্যায্য মূল্য ও সরকারি সহায়তা সার, বীজ ও সরকারি ভাতা যেন প্রকৃত গরিবরা পায়।
ফিংড়ী ইউনিয়নের এক নারী ভোটার সালমা খাতুন বলেন, আমরা এমন চেয়ারম্যান চাই যে আমাদের কথা শুনবে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা নিয়ে যেন দুর্নীতি না হয়।
ফিংড়ী ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও সাংবাদিক মো: আরশাদ আলী জানান- আগামী ডিসেম্বরে আমাদের মেয়াদ ৫বছর পূর্ণ হবে। ৫ বছর সবসময় মানুষের সেবায় কাজ করেছি। আমি এবার আর ভোটে দাঁড়াবো না। তিনি সবার নিকট দোয়া চেয়েছেন।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও কেন্দ্রের খসড়া তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এখনো তফসিল ঘোষণা না হলেও, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সকল প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরার একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, এবারের ইউপি নির্বাচন অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। কারণ, অনেক দিন পর দলীয় প্রতীকের বাইরে গিয়ে উন্মুক্তভাবে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই ভোটাররা তাদের পছন্দের যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
তফসিল ঘোষণার আগেই সাতক্ষীরার ৭৮টি ইউনিয়নে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা বলে দিচ্ছে— এবারের নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়, বরং মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য একটি বড় লড়াই। চায়ের দোকানের সেই তর্ক-বিতর্কই শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হবে। এখন দেখার বিষয়, কে শেষ হাসি হাসেন।
ভোটাররা অপেক্ষায় আছেন, কে তাদের দুয়ারে এসে উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন দেখাবে, আর কে সেই স্বপ্ন পূরণে কাজ করবে। তবে ভোটাররা দেখে শুনে বুঝেই তাদের নেতা নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন।







