নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরায় বীথিকা সাধু নামের এক মুদি ব্যবসায়িকে ইট দিয়ে থেঁতলে নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। রবিবার (২৬ এপ্রিল) দিনগত রাত সাড়ে ৭ টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাগুরা বউবাজার সাধুপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুশংকর দাস নামের এক পরিবহন শ্রমিককে আটক করেছে।

হত্যাকান্ডের শিকার বীথিকা সাধু (৫০) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের মাগুরা সাধুপাড়ার মৃত বিশ্বনাথ সাধুর স্ত্রী।

নিহতের ছেলে কার্তিক সাধু জানান, তার বাবা বিশ্বানাথ সাধু বাড়ির নিকটবর্তী বউ বাজারে কার্তিক স্টোর নামে এক মুদিখানা দোকান পরিচালনা করতেন। দুই বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর মা বীথিকা সাধু ওই ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তিনি নিজে তার ভগ্নিপতি পাটকেলঘাটার কেশব সাধুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশুনা করার সুবাদে প্রতিদিন বাড়ি থেকে যাতায়াত করতেন। রবিবার সকালে তার স্ত্রী পায়েল সাধু বাপের বাড়ি ধুলিহরে যায়। রবিবার রাত সাতটার দিকে মাকে ফোন করলে তিনি দোকানে আসছেন বলে তাকে অবহিত করেন।

তিনি আরো জানান, এরপর পাটকেলঘাটা থেকে ফিরে মাকে পার্শ্ববর্তী তারক সাধুর বাড়িতে ভগবত পাঠ অনুষ্ঠানে যাওয়ার ব্যাপারে জানানো হয়। দীর্ঘক্ষণ মা দোকানে না আসায় বা ফোনে যোগাযোগ করতে না পারায় তিনি ভাগবত পাঠ অনুষ্ঠানের প্রসাদ নিয়ে রাত ১০টার দিকে মটর সাইকেলে বাড়ি ফেরেন। বাড়ি তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখে তাদের বাড়ি দেখভালকারি ডাবলুকে ফোন করে ডেকে আনেন তিনি। মাকে না পেয়ে তার দুই বোন শম্পা সাধু ও রীতা সাধুকে ফোনে অবহিত করেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে খুঁজতে যেয়ে তাদের বাড়ির নিকটবর্তী নিজেদের বাঁশবাগানের পাশে বাসুদেব সাধুর পুকুরে মায়ের মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তার মায়ের মাথা ও দুই চোখসহ মুখমণ্ডল ইট থিয়ে থেঁতলানো হয়েছে বলে তার মনে হয়েছে। পাশেই পড়ে ছিল কিছু আলু ও বাড়িসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চাবির তোড়া। বিষয়টি তাদের পাড়ার পরিবহন শ্রমিক সুশংকর দাস ওরফে তপন বিষয়টি ৯৯৯ এ ফোন করে পুলিশকে অবহিত করেন।

কার্তিক সাধু বলেন- রাত সোয়া ১২টার দিকে পুলিশ তার মায়ের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তবে তার মায়ের কানে এক জোড়া স্বর্ণের দুল খোয়া গেছে । তবে তিনি ধারণা করছেন শুধুমাত্র স্বর্ণের দুল ছিনতাইয়ের জন্য নয়, তার মাকে আর্থিক লেনদেনের জন্য পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। রাত আটটার দিকে তার মায়ের চিৎকার পার্শ্ববর্তী বাসুদেব সাধু ও প্রবীর সাধুর পরিবারের সদস্যরা শুনতে পেয়েছিলেন বলে জানান কার্তিক।

বীথিকা সাধুর আত্মীয় বৈশাখী সাধু বলেন- সন্ধ্যা হলেই এই বাঁশ বাগানে অপরিচিত মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। তারা নেশা করার জন্য এখানে আসতেও পারে। আমরা তাদের চিনিনা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৌদি টাকার ব্যবসাও করতেন। হয়তো বড় ধরনের কোন লেনদেনের জন্য পরিকল্পিতভাবে বৌদিকে হত্যা করা হতে পারে। যদি এরকম কিছু হয় তবে নিশ্চয় বাড়ীতে থাকা পাওনাদারদের তথ্য দেখে হত্যাকারীকে শনাক্ত করা যেতে পারে।

এদিকে মাগুরা বৌবাজার এলাকার কয়েকজন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন জানান, বীথিকার লাশ পুলিশ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নারকেলতকলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য মাগুরা গ্রামের দীলিপ দাসের ছেলে সুশংকর দাস বাধা দেন। তিনি বলেন, বাড়ির তালাবন্ধ করে দোকানে যাওয়ার সময় ৭টা ২০ মিনিটে ছেলে ও মায়ের সাথে ফোনে কথা হয়। আবার রাত ৮টার দিকে পুকুর মালিক বাসুদেব সাধুর পরিবারের লোকজন বীথিকার চিৎকার শুনতে পায়। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হতে পারে। হিন্দুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে পুলিশ সুপার মহোদয় ঘটনাস্থলে না আসা পর্যন্ত লাশ নিয়ে যেতে দেবেন না বলে জানালে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিনি থানা লকআপে ছিলেন।

লাশের ময়না তদন্তকারি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ রাশেদুজ্জামান জানান, মৃত্যুর ব্যাপারে এই মুহুর্তে কোন মন্তব্য করা যাবে না।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাসুদুর রহমান জানান, খবর পেয়ে তিনিসহ পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। কোন ভারী জিনিস দিয়ে বীথিকা রানী সাধু’র মুখমণ্ডল থেঁতলে নির্যাতনের পর হত্যা করে তাকে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। তবে হত্যার কোন ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুর ১২টায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। সুশংকর দাস নামে একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *