নিজস্ব প্রতিনিধি: দীর্ঘ ৫৫ বছরের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করে সাতক্ষীরা জেলার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় সুন্দরবন উপকূলীয় বোর্ড ও মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানিয়েছে সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটি।

বুধবার (৩ জুন) জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর এই সংক্রান্ত একটি ২১ দফা স্মারকলিপি পেশ করা হয়।

স্মারকলিপি প্রদানকালে সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শেখ আজাদ হোসেন বেলালের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলিনুর খান বাবু, অধ্যাক্ষ আব্দুল হামিদ, আশেক ই এলাহী, অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান দিলু, কলারোয়া নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল হাবিবুর রহমান হাবিব, নাগরিক নেতা কিশোরী মোহন সরকার, মাধব চন্দ্র দত্ত, শেখ সিদ্দিকুর রহমান, কমরেড আবুল হোসেন, সিনিয়র সাংবাদিক এম কামরুজ্জামান, আব্দুস সামাদ, মনিরুজ্জামান, এডভোকেট মনিরুদ্দিন, প্রতিবন্ধী আন্দোলনের নেতা আবুল কালাম আজাদ এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা বাইজিদ হোসেন হাসান।

স্মারকলিপিতে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, সাতক্ষীরা জেলাটি খাদ্য উৎপাদনে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চল। এখান থেকে বছরে গড়ে ৫ লক্ষাধিক মেট্রিক টন ধান, ২৮ হাজার মেট্রিক টন বিদেশে রপ্তানিযোগ্য চিংড়িসহ ১ লক্ষ ৫০ হাজার মেট্রিক টন মাছ, প্রায় ২ লক্ষ মেট্রিক টন দুধ, ২ লক্ষ মেট্রিক টন শীতকালীন শাকসবজি, ৭৫ হাজার মেট্রিক টন আম এবং ১৫ হাজার মেট্রিক টন কুল উৎপাদিত হয়। এছাড়াও ভোমরা স্থলবন্দর থেকে বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব এবং সুন্দরবন ও মৎস্য সম্পদ থেকে বিপুল পরিমাণ আয় আসে।

তবে অর্থনৈতিকভাবে এত অবদান রাখা সত্ত্বেও জেলাটি প্রতিনিয়ত ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙন, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় জেলায় দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং টেকসই উন্নয়নের অভাবে বহু মানুষ স্থায়ী ও अस्थायीভাবে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় জনসংখ্যা ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন যে, সাতক্ষীরার সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনা করে এবং এর ভৌগোলিক ঝুঁকি দূর করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে এই ২১ দফা দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। বিশেষ করে আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই যেন উপকূলের বেড়িবাঁধ সংস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নাগরিক কমিটির প্রধান দাবিগুলো: ১. উপকূলীয় বোর্ড গঠন: সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকাকে ‘দুর্যোগ প্রবণ এলাকা’ ঘোষণা করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য “সুন্দরবন উপকূলীয় বোর্ড ও মন্ত্রণালয়” গঠন করে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা।

২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম আগামী শিক্ষাবর্ষ (বর্তমান সেশন) থেকেই দ্রুত চালু করা।
৩. রেললাইন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: সাতক্ষীরা থেকে মুন্সীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু করা। এছাড়া শহরের প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং ঢাকার সাথে দূরত্ব কমাতে মাওয়া-ভাঙ্গা-নড়াইল-নবমুখী-চুকনগর-সাতক্ষীরা সড়ক নির্মাণ করা।

৪. ভোমরা স্থলবন্দর: ভোমরা স্থলবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া এবং বসন্তপুর নদীবন্দর দ্রুত চালু করা। ৫. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা: সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে একটি ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার স্থাপন এবং জেলা ও উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা।

৬. কৃষি ও কোল্ড স্টোরেজ: আম, কুল, লিচু ও সবজি সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার, সংরক্ষণাগার এবং কৃষিভিত্তিক ইকো-ভিলেজ মার্কেট স্থাপন করা।
৭. পর্যটন ও শিল্প: সুন্দরবনের অভ্যন্তরে একাধিক পর্যটন স্পট তৈরি করা এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প কর্মসংস্থান ও আইটি পার্ক তৈরি করা।
৮. নদী ও জলাবদ্ধতা নিরসন: সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদী-খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা এবং জলাবদ্ধতা দূর করতে কপোতাক্ষ, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *