ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও চলাচলের কাদাময় পথ নিয়ে চরম দুর্ভোগ, নতুন ভবন নির্মাণ হবে কবে?

ফজলুল হক : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত (১০৩ নং)কালিগঞ্জ সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় ১৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ

জরাজীর্ণ ভবন, অন্যদিকে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র পথটি সামান্য বৃষ্টিতেই কাদাপানি ও জলাবদ্ধতায় পরিণত হয়। স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হলেও দীর্ঘ বছর ৩৮ বছর ধরে বিদ্যালয়টি যেন উন্নয়নবঞ্চিত। উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ও আধুনিক ভবন নির্মাণ হলেও সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো উন্নয়নের তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে পাঠদান।

গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে ভেতরে যাওয়ার পথটি কাদামাটিতে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে এই পথ দিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাদা-পানি পেরিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে হয়।

বিদ্যালয়টির বর্তমান ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা গেছে। স্থানীয় ও অভিভাবকদের আশঙ্কা, ঝুঁকিপূর্ণ এ ভবনে পাঠদান চলতে থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত ভালো শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক কক্ষ বা লাইব্রেরির সুব্যবস্থা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গঙ্গা সরকার বলেন, আমাদের অল্প জায়গা। চলাচলের পথের জন্য আলাদা জায়গা কোথায় পাব? ‌কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠের পাশ দিয়ে রাস্তা করতে গেলে তারা জায়গা দিতে চান না। তবে কোনো না কোনোভাবে চলাচলের পথের ব্যবস্থা হয়ে যায়। এজন্য চেষ্টা করতে হবে।
এদিকে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের জমি মাত্র পাঁচ শতাংশ।
এ কারণে বারবার বাজেট এসে ফিরে যায়।

সহকারী শিক্ষক হাসিব মেহেদী হাসান বলেন নতুন ভবন নির্মাণের জন্য কয়েকবার বাজেট এসেছ পরবর্তীতে বাতিল হয়ে গেছে কি কারনে আমার জানা নেই। প্রশ্ন উঠেছে—

মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির মধ্যে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কোনো ব্যবস্থা কি করা সম্ভব নয়? উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি সরকারি বিদ্যালয় কি বছরের পর বছর জরাজীর্ণ অবস্থায়ই পড়ে থাকবে ,এমন প্রশ্নই এখন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গঙ্গা সরকার ও

কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্র বাঁচাড় স্বামী-স্ত্রী। একই বাউন্ডারির মধ্যে থাকা দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের চলাচলের বিষয়টি সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবকরা। তাদের দাবি, দুই প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে অন্তত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের একটি স্থায়ী বা কার্যকর ব্যবস্থা করা সম্ভব।

এ বিষয়ে কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্র বাঁচাড় বলেন, সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা খুবই সীমিত। তারা আমাদের স্কুলের পথ দিয়ে চলাচলের পথ করলে মাঠের জায়গা কমে যাবে। তাছাড়া আমাদের একটি পুরাতন ভবন রয়েছে। সেটি বরাদ্দ হলে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ হতে পারে। এ কারণে স্থায়ী সড়ক করতে দেওয়া সম্ভব হবে না।

তবে অস্থায়ীভাবে ইট সোলিং করলে অসুবিধা হবে না। আপাতত মাঠের দক্ষিণ পাশ দিয়ে চলাচল করলে আমাদেরও কোনো আপত্তি নেই। জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ১০৩ নং কালিগঞ্জ সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ছয়জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে আছেন প্রধান শিক্ষক গঙ্গা সরকার, সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শেখ সিরাজুল ইসলাম, হাসিব মেহেদী হাসান, সুজন দত্ত, আরিজুল ইসলাম ও নাজমুন নাহার।

বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করছেন বলেও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ ও যাতায়াতের পথ সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে।

এ বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বলেন, বর্তমান যুগে কালিগঞ্জ সদরে এমন জরাজীর্ণ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে—এটি আমার জানা ছিল না।

বিষয়টি এই প্রথম শুনলাম। আমি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করব। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালিগঞ্জ উপজেলা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক কুমার বিশ্বাস যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না।

আমি জরুরি ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষককে ডেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখব এবং দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। স্থানীয় অভিভাবকদের দাবি, একটি বিদ্যালয়ের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের পথ ও ঝুঁকিমুক্ত ভবন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মৌলিক

নিরাপত্তার বিষয়। তাই দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণ এবং শিক্ষার্থীদের চলাচলের উপযোগী রাস্তা নির্মাণের ব্যবস্থা করা হোক। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *