নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা শহরের নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হওয়া প্রায় এক কোটি টাকা, পরিচালনা কমিটি গঠন এবং প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীকে ঘিরে বিরোধের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। বিরোধের প্রভাব শিক্ষা কার্যক্রমেও পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

প্রধান শিক্ষক ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তহবিলে বড় অঙ্কের অর্থ জমার বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

অন্যদিকে, বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ক্লাস ও শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৪ সালে আব্দুল মালেক গাজী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত অবস্থা ভালো ছিল না। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত বেঞ্চ ছিল না। কিছু বেঞ্চ ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল। শিক্ষকদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না।

বিজ্ঞানাগারে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি এবং ছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগারের সমস্যাও ছিল। প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যালয়ের তহবিলে ছিল মাত্র ২১ হাজার টাকা। বিভিন্ন খাতে বিদ্যালয়ের প্রায় দেড় লাখ টাকা দেনা ছিল। তাঁর দাবি, গত ১২ বছরে শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ ছাত্রী পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ে ২৯টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন শিক্ষাসহায়ক সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের দাবি, বিদ্যালয়ের তহবিলে বর্তমানে প্রায় এক কোটি টাকা রয়েছে এবং কোনো ঋণ নেই। আ

ব্দুল মালেক গাজী বলেন, ‘৪৫ বছরের পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠানের তহবিলে যখন মাত্র ২১ হাজার টাকা ছিল, সেখান থেকে ১২ বছরে প্রায় এক কোটি টাকা হয়েছে। অথচ এই অর্থই এখন আমার জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ২১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৫০-তে পৌঁছায়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৫৫ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল।

তবে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে বলে বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষকদের উপস্থিতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য হিমুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে।

তবে বর্তমানে কিছু বিষয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এসব সমস্যার সমাধান করে দ্রুত স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। সাবেক পরিচালনা কমিটির সদস্য সিদ্দিকুর রহমান বলেন, প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মানের পরিবর্তন হয়েছে। খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিদ্যালয়টি পুরস্কারও পেয়েছে। বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের অভিযোগ, কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না এবং যথাসময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন না। এ ছাড়া একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর পরিচালনা কমিটি তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বলে জানা গেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ওই শিক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একজন অভিভাবক বলেন, তাঁর দুই মেয়ে নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তাঁর ভাষ্য, আব্দুল মালেক গাজী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। কোনো বিরোধের কারণে যেন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।

প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজী বলেন, দীর্ঘ চাকরিজীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাঁর দাবি, তাঁকে বেআইনিভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে তাঁকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হওয়া বড় অঙ্কের অর্থ এবং সেই অর্থ ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আব্দুল মালেক গাজী বলেন, নতুন পরিচালনা কমিটি গঠন, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা নিয়ে নানা ধরনের তৎপরতা চলছে। বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক বলেন, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিরোধের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরা। কোনো শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক বা পরিচালনা কমিটির সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে সমাধান করা উচিত।

তাঁদের মতে, বিদ্যালয়ের তহবিলে থাকা প্রায় এক কোটি টাকা, পরিচালনা কমিটির কার্যক্রম এবং প্রধান শিক্ষককে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীকে দ্রুত ফিরিয়ে এনে বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের দাবী, প্রশাসনিক বা ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের দায় যেন শিক্ষার্থীদের বহন করতে না হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *